সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ

সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ

সিপাহী বিদ্রোহের ( ১৮৫৭ খ্রিঃ ) আগে ভারতে যে সমস্ত ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন হয়েছিল , তার মধ্যে সর্বাধিক ব্যাপক ছিল সাঁওতাল বিদ্রোহ ( ১৮৫৫ খ্রিঃ ) । ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে , “ ১৮৫৭ – র মহাবিদ্রোহকে যদি স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে মনে করা হয় , তাহলে সাঁওতাল বিদ্রোহকেও সেই মর্যাদ দেওয়া উচিত । ” সুপ্রকাশ রায় বলেছেন , “ এই বিদ্রোহ ( সাঁওতাল ) ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি মূলে নাড়া দিয়েছিল । ”  অন্যান্য বিদ্রোহের মতো এক্ষেত্রেও বিদ্রোহের প্রধান কারণ ছিল মহাজন ও জমিদার শ্রেণির শোষণ-অত্যাচার এবং ব্রিটিশ সরকারের অপশাসন । 

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জন্য ক্ষোভ 

ভারতের প্রাচীনতম অধিবাসী হল এই সাঁওতাল উপজাতি । এরা বিশ্বাস করে জমিতে যে শ্রম দিয়ে ফসল ফলাবে জমি তারই । লর্ড কর্নওয়ালিশের আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তিত হলে সাঁওতালদের অস্বস্তি ঘটে এবং ভাগলপুরের কালেক্টর ক্লীভল্যান্ডের অনুমতিক্রমে রাজমহলের পাহাড় সংলগ্ন অঞ্চলে নতুন করে ঘর বাঁধে । এর নাম হয় ‘ দামিন-ই-কোহ ’ ( পাহাড়ের প্রান্তদেশ ) ।  

লর্ড বেন্টিঙ্কের শাসনকালে শত শত সাঁওতাল পরিবার দামিন-ই-কোহ’তে এসে বাস করতে শুরু করে । মেদিনীপুর , বীরভূম , বাঁকুড়া , ধলভূম , মানভূম , পালামৌ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে বহু সাঁওতাল পরিবার আবাদি জমি ছেড়ে দিয়ে এই জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে উঠে আসে । এখানে এরা কঠোর পরিশ্রম করে বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে মাঠকে চাষযোগ্য জমিতে রূপান্তরিত করে ।  

১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ‘ দামিন-ই-কোহ’তে ১৪৩৭ টি গ্রাম গড়ে ওঠে এবং লোকসংখ্যা দাঁড়ায় ৮২,৭১৫ -তে । অতঃপর এই নবগঠিত অঞ্চলে নজর পড়ে সরকারের এবং তারা এখানে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করে । ফলে সৃষ্টি হয় জমিদার শ্রেণির , যার আর এক নাম শোষক শ্রেণি । জমিদাররা সহজ সরল সাঁওতালদের নানাভাবে প্রভাবিত করে তাদের জমি গ্রাস করতে থাকে । এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে আজন্ম স্বাধীন সাঁওতাল সম্প্রদায় । 

মহাজনদের শোষণ 

‘ দামিন-ই-কোহ ‘ প্রতিষ্ঠিত হবার কিছুদিনের মধ্যেই বেনিয়া , ভোজপুরী , ভাটিয়া ও অন্যান্য শ্রেণির বহু মানুষ সেখানে গিয়ে বসবাস শুরু করে । এই ধূর্ত ব্যবসায়ী ও সুদখোর মহাজনশ্রেণি সাঁওতালদের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে । সাঁওতালরা দারিদ্র্যের কারণে খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে এইসব মহাজনরা তাদের সুদে টাকা দিত । কিন্তু যতই ওয়াশিল দিক , সাঁওতালদের ঋণ কখনোই শোধ হত না । তাদের অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে মহাজনশ্রেণি সুদের এমন হিসেব করত যাতে ওই পরিবার বংশপরম্পরায় ঋণভার বহন করতে বাধ্য হত ।  

সুদ ওয়াসিলের নামে মহাজনরা তাদের জমি-জমা , ঘটি-বাটি সব কেড়ে নিতে দ্বিধা করত না । এইসব ব্যবসায়ী মহাজনদের লেনদেন এর মাপকাঠি ছিল অদ্ভুত । এরা সিঁদুর মাখানো দু’খণ্ড পাথর বাটখারা হিসেবে ব্যবহার করত । সাঁওতালদের কিছু দেওয়ার সময় এরা ব্যবহার করত ছোটো বাটখারা , কিন্তু নেবার সময় ব্যবহার করত বড়ো বাটখারাটি । এভাবে নিঃশেষ হতে হতে সহজ সরল সাঁওতালরা বিদ্রোহে ঝাপিয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছিল । 

দাস প্রথা 

মহাজন ও ভদ্রলোক ব্যবসায়ী জমিদারগণ আইনের সুযোগ নিয়ে সাঁওতালদের ক্রীতদাসে পরিণত করত । ঋণ শোধে ব্যর্থ সাঁওতাল মহাজনদের কাছে ‘ বন্ড ’ দিয়ে সপরিবারে মহাজনদের ‘ দাস ‘ হবার ঘটনা বহু ছিল । উইলিয়ম হান্টার দেখেছেন যে , কয়েক প্রজন্ম ধরে ঋণশোধ করেও বহু সাঁওতাল পরিবার ঋণ মুক্ত হতে পারেনি এবং মহাজনদের বাড়িতে বেগার শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে । 

রেল কর্মচারীদের অভব্যতা 

অষ্টাদশ শতকের চল্লিশের দশকে রাজমহলের দিকে রেললাইন পাতার কাজ চলছিল । তিলাপাহাড় , ভাগলপুর প্রভৃতি অঞ্চলে রেলপথ নির্মাণের সূত্রে ‘ দামিন-ই-কোহ’তে সাহেবদের আগমন ঘটে । এইসব সুসভ্য ইংরেজ কখনো প্রলোভন , কখনো জোর দেখিয়ে সাঁওতালদের জীবন বিষময় করে তোলে । নানা প্রলোভন দেখিয়ে এরা বিনামূল্যে সাঁওতালদের ছাগল , মুরগি , হাঁস প্রভৃতি গ্রাস করে , এমনকি সাঁওতাল রমণীদের প্রতিও এরা দুর্ব্যবহার শুরু করে । ফলে ক্ষুব্ধ হয় সাঁওতাল সমাজ । 

নীলকরদের অত্যাচার 

জমিদার-মহাজনদের দোসর ছিল নীলকর সাহেবরা । এরা জোর করে সাঁওতালদের জমিতে নীলচাষ করতে বাধ্য করত । নীলচাষ না করলে সাঁওতালদের উপরে চালাত নির্মম উৎপীড়ন । ছোটো ছেলে বা মেয়েরাও এই অত্যাচার থেকে বাদ পড়ত না ।  

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে , সাঁওতাল বিদ্রোহ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না । এর মূলে ছিল অর্থনৈতিক শোষণ ও তার জন্য উৎপন্ন ক্ষোভ । এই আন্দোলন ছিল জমিদার , মহাজন , নীলকর প্রভৃতির শোষণ , উৎপীড়ন ও ব্রিটিশ সরকারের একপেশে ভূমিকার অনিবার্য পরিণতি ।  

সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা ও সমাপ্তি 

সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা হয় ( ১৮৫৫ খ্রিঃ ) ভগনাডিহি গ্রাম থেকে । বিদ্রোহের প্রধান নেতা ছিলেন চুনাই মুর্মুর দুই পুত্র সিধু ও কানু । এঁরা বিদ্রোহের সাথে ধর্মের প্রেরণাকে জুড়ে দেন এবং স্বাধীন সাঁওতাল শাসন প্রবর্তনের কথা ঘোষণা করেন । বিদ্রোহীরা জমিদার-মহাজনদের খাজনা ও ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেয় । সমস্ত সাঁওতাল ও অন্যান্যদের ‘ সিধু ও কানু’র দরবারে খাজনা দেবার নির্দেশ দেওয়া হয় ।  

প্রথমদিকে বিদ্রোহীরা সাফল্য অর্জন করতে থাকে । দু-একটি ক্ষেত্রে জমিদার-মহাজনের সাহায্যে আগত ইংরেজ বাহিনী সাঁওতালদের তির-ধনুকের দাপটে পিছু হটতে বাধ্য হয় । বিদ্রোহীদের হাতে বহু শোষক মহাজন প্রাণ দেয় । রাজমহলের নিকটবর্তী কিছুটা অঞ্চল বিদ্রোহীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যায় । এমতাবস্থায় সরকার বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনী নামায় । তির-ধনুকের সাথে বন্দুক-কামানের অসম লড়াইয়ে পরাজিত হয় সাঁওতালরা । সিধু ও কানু নিহত হন । বহু সাঁওতালকে কারাদণ্ড দেওয়া হয় । ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের গোড়ায় সাঁওতাল বিদ্রোহ সম্পূর্ণভাবে দমিত হয় । 

সাঁওতাল বিদ্রোহের তাৎপর্য 

সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও কম তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না । 

( ১ ) সাঁওতাল বিদ্রোহ নিছক উপজাতি বিদ্রোহ ছিল না । এটি ছিল ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ কৃষিজীবী মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ । মহাজন জমিদারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে কৃষকেরা ইংরেজ শাসনকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল । 

( ২ ) সাঁওতাল বিদ্রোহ শুধুমাত্র সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না । নিম্নবর্ণের বহু হিন্দু এই বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিল । তাই শুধুমাত্র উপজাতি বিদ্রোহ না থেকে এই বিদ্রোহের মধ্যে শোষণের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের পদধ্বনি শ্রুত হয়েছিল । 

( ৩ ) সাঁওতাল বিদ্রোহকে ১৮৫৭ ’ -র মহাবিদ্রোহের পূর্বসূরি বলা যায় । এটি ছিল ওয়াহাবি আন্দোলন ও মহাবিদ্রোহের সংযোগ সূত্র । তাই এটি গুরুত্বে মহান । 

( ৪ ) সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল প্রধানত ‘ দিকু ’ শ্রেণির ( ভদ্রলোক ) বিরুদ্ধে । ভদ্রতার মুখোশের আড়ালে এদের নগ্ন শোষক চরিত্র প্রকাশ্যে তুলে ধরেছিল তথাকথিত অশিক্ষিত , অভদ্র সাঁওতালেরা । আবার এদের আন্দোলনই ভারতবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিল বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে ।

error: Content is protected !!