রণজিৎ সিংহের কৃতিত্ব

রণজিৎ সিংহের কৃতিত্ব

অষ্টাদশ শতকে ভারত ইতিহাসে যে কজন প্রতিভাবান রাষ্ট্রবিদের নাম পাওয়া যায় , তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিলেন পাঞ্জাব কেশরী রণজিৎ সিংহ । ফরাসি পর্যটক জ্যাকম্ ( Jaquc mont ) -এর ভাষায় : রণজিৎ ছিলেন “অনন্য সাধারণ ব্যক্তি , নেপোলিয়নের যেন এক ক্ষুদ্র সংস্করণ ।”

ক্ষমতায় উত্তরণ

১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে গুজরানওয়ালায় রণজিৎ সিংহের জন্ম হয় । তাঁর পিতা মহাসিংহ ছিলেন সুকেরচাকিয়া ‘ মিসল ’ -এর নেতা । পিতার মৃত্যুর ফলে মাত্র ১২ বছর বয়সে রণজিৎ সুকেরচাকিয়া মিসলের নেতা হন । তাঁর বাম চোখ ছিল অন্ধ ; পুঁথিগত শিক্ষাও তার ছিল না । কিন্তু বাস্তব বুদ্ধি , উচ্চাশা , কর্মদক্ষতা প্রভৃতি নিজস্ব প্রতিভার ফলে তিনি অখণ্ড শিখ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথে সাফল্যের সাথে বহুদূর অগ্রসর হয়েছিলেন । কাবুলের অধিপতি জামান শাহ ভারত আক্রমণ করলে ( ১৭৮৯ খ্রিঃ ) রণজিৎ তার প্রতিরোধে নামেন । পরে রণজিৎ -এর সহায়তায় তিনি লাহোর দখল করতে সক্ষম হন । রণজিৎ -এর বন্ধুত্বে মুগ্ধ হয়ে জামান শাহ তাঁকে ‘ রাজা ’ উপাধিতে ভূষিত করেন । পরের বছর জামান শাহ কাবুলে ফিরে এলে  রণজিৎ লাহোর দখল করেন । অনেকের মতে , জামান শাহ রণজিৎকে লাহোর দান করে গিয়েছিলেন ।  

তারপর যুদ্ধ দ্বারা রাজ্যজয়ে তিনি মনোনিবেশ করেন । ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে অমৃতসর রণজিৎ সিংহের অধিকারে আসে । একে একে শতদ্রু নদীর উত্তর তীরের শিখ মিসলগুলি রণজিৎ সিংহের বশ্যতা স্বীকার করে নেয় । এই সময়ে রণজিৎ সিংহ প্রথম ইংরেজের সংস্পর্শে আসেন । দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সূত্রে ব্রিটিশ সেনাপতি লর্ড লেক কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে মারাঠা সর্দার হোলকার পাঞ্জাব সীমান্তে উপস্থিত হন এবং ইংরেজের বিরুদ্ধে রণজিতের সাহায্য প্রার্থনা করেন । এদিকে লর্ড লেক পাঞ্জাব থেকে হোলকারকে বহিষ্কারের দাবি জানাতে থাকেন । এমতাবস্থায় অমৃতসরে সর্বত খালসার সঙ্গে পরামর্শক্রমে রণজিৎ হোলকারকে পাঞ্জাব ছেড়ে চলে যেতে বলেন । ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে লর্ড লেকের সাথে রণজিৎ লাহোরের সন্ধি স্বাক্ষর করেন । স্থির হয় , রণজিৎ হোলকারকে কোনোরকম সাহায্য দেবেন না । এর বিনিময়ে ইংরেজরা শিখ রাজ্যে প্রবেশ করবে না এবং শিখ স্বার্থ বিরোধী কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করবে না ।

অখন্ড গঠনের শিখ সাম্রাজ্য পরিকল্পনা

উত্তরোত্তর সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে রণজিৎ “ অখিল শিখ সাম্রাজ্য ” স্থাপনের পরিকল্পনা করেন এবং শতদ্রু নদীর দক্ষিণ তীরস্থ শিখ মিসলগুলি দখল করতে উদ্যোগী হন । এই সময়ে দক্ষিণ তীরস্থ শিখ মিসলগুলির মধ্যে আত্মকলহ চলছিল । তারা রণজিৎ -এর সাহায্য প্রার্থনা করে । রণজিৎ সিংহ এই সুযোগে লুধিয়ানার উপর নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন । কিছুদিনের মধ্যেই রঞ্জিৎ -এর মনোভাব বুঝতে পেরে দক্ষিণ তীরস্থ মিসলের সর্দারগণ ইংরেজের সাহায্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন । ঝিন্দের রাজা ভাগ সিং , কৈথালার লাল সিংহ , পাতিয়ালার প্রতিনিধি চৈত সিংহ প্রমুখ দিল্লির ব্রিটিশ রেসিডেন্ট মিঃ সেটনের সাহায্য প্রার্থনা করে এক আবেদনপত্র পেশ করেন ।

রণজিৎ সিংহের সাথে ইংরেজদের সম্পর্ক

এদিকে নিজেদের নিরাপত্তার কারণে ইংরেজগণ সেই সময় পাঞ্জাবে একটি শক্তিশালী মিত্র রাজ্যের প্রয়োজন অনুভব করেছিল । কারণ তখন ফ্রান্স কর্তৃক আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে ভারতে আক্রমণের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল । তাই ইংরেজ পক্ষ চাইছিল পাঞ্জাবে শক্তিশালী রাজ্য থাকলে বিদেশিদের তারাই মোকাবিলা করবে । এই বিবেচনায় বড়লাট লর্ড মিন্টো শিখ সর্দারদের সাহায্যের আবেদন গ্রহণ করলেও , রণজিতের সাথে বিরোধ চাইছিলেন না । তাই লর্ড মিন্টোর দূত চার্লস মেটকাফ রণজিৎ সিংহের দরবারে উপস্থিত হয়ে তার মিত্রতা লাভের জন্য আলাপ চালাতে থাকেন । একই সঙ্গে রণজিতের উপর চাপ সৃষ্টির জন্য পাঞ্জাব সীমান্তে একদল ব্রিটিশ সৈন্য মোতায়েন রাখা হয় । 

রণজিৎ শিখ রাজ্যে তাঁর সার্বভৌম কর্তৃত্বের স্বীকৃতির বিনিময়ে ইংরেজের সাথে মিত্রতা স্থাপনের শর্ত দেন । কিন্তু ইতিমধ্যেই ফরাসি আক্রমণের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে গেলে লর্ড মিন্টো কিছুটা কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেন । শিখ রাজ্যগুলির বিরোধিতা এবং ইংরেজ কোম্পানির হুমকির চাপে রণজিত শেষ পর্যন্ত ইংরেজের সাথে অমৃতসরের সন্ধি ( ১৮০৯ খ্রিঃ ) স্বাক্ষর করেন । অমৃতসরের সন্ধি দ্বারা—

( ১ ) শতদ্রু নদী রণজিৎ সিংহের রাজ্যের দক্ষিণ সীমান্ত হিসেবে নির্ধারিত হয় ।

( ২ ) রণজিৎ শতদ্রু -র দক্ষিণের মিসলের উপর সব দাবি ত্যাগ করেন । এগুলি ইংরেজের কর্তৃত্বাধানে স্থাপিত হয় ।

( ৩ ) উভয় পক্ষ ‘ স্থায়ী মৈত্রী ’ বজায় রাখতে প্রতিশ্রুত হয় । এইভাবে শিখ সাম্রাজ্য দ্বিধাবিভক্ত হয় ।

রণজিৎ সিংহের শাসন ব্যবস্থা  

সুশাসক হিসেবে রণজিৎ সিংহ মহান কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন । রাজ্য জয়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অঞ্চলে একটি সুস্থ , সবল , ভারসাম্য যুক্ত শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করে তিনি শিখ জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে চেয়েছিলেন । প্রশাসনে তিনিই ছিলেন সর্ব্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী । তবে রণজিৎ এর স্বৈরাচারিতা স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত হয়নি । জাতি ধর্ম নির্বিশেষে প্রকৃত যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের তিনি কর্মচারী পদে নিয়োগ করতেন । স্বয়ং সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হলেও তিনি মন্ত্রী ও পরামর্শদাতা মণ্ডলী নিয়োগ করতেন । মন্ত্রীদের স্বতন্ত্র দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া থাকত । ‌  

শাসনতান্ত্রিক বিভাগ 

শাসন কার্যের সুবিধার জন্য রণজিৎ তাঁর রাজ্যকে চারটি সুবায় ( প্রবেশ ) বিভক্ত করেন । এগুলি হল মুলতান , লাহোর , কাশ্মীর এবং পেশোয়ার । সুবার শাসন কর্তাকে বলা হত ‘ নাজিম ’ । প্রতিটি সুবা বিভক্ত ছিল জেলায় ৷ শাসন কর্তার উপাধি ছিল ‘সর্দার ’ । জেলাগুলি ‘ তালুকে ’ বিভক্ত ছিল । কৃষকদের কাছে থেকে উৎপন্ন শস্যের এক অংশ রাজস্ব রূপে আদায় করা হত । রাজস্ব নগদে ( কংকুত ) বা শস্য ( বাটাই ) দেওয়া চলত । বণিকদের কাছ থেকেও শুল্ক আদায় করা হত । তবে কৃষক বা বণিকের স্বার্থের প্রতি রণজিৎ -এর সজাগ দৃষ্টি ছিল । 

রণজিৎ সিংহের বিচার ব্যবস্থা 

বিচার বিভাগের সর্ব্বোচ্চে ছিলেন রণজিৎ স্বয়ং । তবে গ্রামাঞ্চলে পঞ্চায়েতের উপর বিচারের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল । জেলায় সর্দারগণ এবং প্রদেশে নাজিমগণ বিচার কার্য পরিচালনা করতেন । কোনো বিচারে সন্তুষ্ট না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করা যেত । লাহোরে ‘ আদালত থালা ‘ নামক একটি সর্ব্বোচ্চ বিচারালয় প্রতিষ্ঠিত ছিল । দণ্ডদানে নমনীয়তা দেখানো হত । প্রাণদণ্ড ছিল না বললেই চলে । 

রাজস্ব নীতি

রণজিৎ সিংহের আয়ের প্রধান উৎস ছিল ভূমি রাজস্ব । জমির উপর রায়তদের দাবি স্বীকৃত ছিল । সাধারণ কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি রাজস্ব আদায় করা হত । রাজস্ব নির্ধারণের জন্য বাটাই প্ৰথা , কানকুত প্রথা , বিমা প্রথা ইত্যাদি চালু ছিল । বাটাই প্রথানুযায়ী ফসল পাকার পর তার উৎপাদনের ভিত্তিতে রাজস্ব স্থির হত । কানকুত প্রথায় শস্য কাটার আগেই রাজস্ব নির্ধারিত হত । রণজিৎ ক্রমে সবক্ষেত্রেই কানকুত প্রথা চালু করেন এবং ফসলের পরিবর্তে নগদ অর্থে রাজস্ব আদায় প্রথা চালু করেন । রাজস্বের হার ছিল উৎপাদনের এক এর দুই অংশ বা এক এর তিন অংশ । কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিঘার মাপ অনুযায়ী , আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমিচাষের জন্য ব্যবহৃত লাঙলের সংখ্যানুযায়ী রাজস্ব স্থির করা হত । আবার অনেক ক্ষেত্রে একটি কূপের সাহায্যে যে জল চাষের জন্য সরবরাহ করা হত , তার ভিত্তিতেও রাজস্ব নির্ধারণ করা হত । ভূমি রাজস্ব ছাড়াও কয়েকটি আবওয়াব আদায় করা হত । এ ছাড়া পশুপালকদের ‘ তিরান’ নামক একটি কর দিতে হত । অবশ্য কৃষিকাজের জন্য যারা পশুপালন করত , তাদের এই কর দিতে হত না । কৃষি উন্নয়নের প্রতিও রণজিতের লক্ষ্য ছিল । এজন্য তিনি কৃষকদের ঋণদান , খালখনন প্রভৃতি কর্মসূচি নেন । প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কালে উৎপাদন ব্যাহত হলে কৃষকদের রাজস্ব মকুবের দৃষ্টান্ত আছে । 

সামরিক সংগঠন 

রণজিৎ সিংহের সামরিক প্রশাসন ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য । সেনাবাহিনীর দক্ষতা ও নিয়মানুবর্তিতার উপর তিনি অধিক গুরুত্ব দিতেন । তার সুসংগঠিত খালসা বাহিনীকে অনেকে ইংল্যান্ডের অলিভার ক্রমওয়েলের ‘ Iron Side ’ বাহিনীর সাথে তুলনা করেছেন । শিখধর্মীয় আদর্শের সাথে সামরিক শৃঙ্খলাবোধের সমন্বয়ে গঠিত খালসা বাহিনী ছিল অতি দুর্ধর্ষ । ফরাসি সেনাপতি ভেঞ্চুরা ( Ventura ) ও এলার্ড ( Allard ) -এর প্রশিক্ষণে রণজিৎ সিংহ তাঁর বাহিনীর আধুনিকীকরণ করেন । পাশ্চাত্য যুদ্ধরীতির উপযোগিতা সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট সচেতন ছিলেন । তবে প্রাচীন ‘ গেরিলা ’ যুদ্ধ পদ্ধতিকেও তিনি বর্জন করেননি । তাঁর অশ্বারোহী বাহিনী যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল । সৈনিকদের জায়গির দেওয়ার পরিবর্তে তিনি নগদ অর্থদানের ব্যবস্থা করেন । 

সমালোচনা

রণজিৎ সিংহের শাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ত্রুটি মুক্ত ছিল না । যেমন— 

( ১ ) তাঁর ভূমি রাজস্বের হার ছিল বেশ চড়া । রাজস্ব সংগ্রাহকদের নিপীড়ন থেকে সাধারণ কৃষকদের রক্ষা করার ব্যাপারে তিনি বেশ উদাসীন ছিলেন । 

( ২ ) তাঁর স্বজনপোষণ নীতি ও পক্ষপাতমূলক আচরণ নবগঠিত শিখ রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করেছিল । অ-শিখ ডোগ্রা রাজপুতদের উপর অত্যধিক নির্ভর করার ফলে শিখ জাতীয়তাবোধ দানা বাঁধতে পারেনি । 

( ৩ ) বিশাল সামরিক বাহিনী গঠন করলেও রণজিৎ সৈন্যদের নিয়মিত বেতন দিতে পারতেন না । ফলে সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় । তাঁর বাহিনীর আনুগত্য ছিল কেবল রাজার প্রতি , কোনো রাষ্ট্রের প্রতি নয় । ফলে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে খালসা বাহিনী স্ব-প্রধান হয়ে ওঠে । তাই ড. আর. সি. মজুমদার বলেছেন , “ রণজিতের বিশাল বাহিনীর মধ্যেই শিখ রাষ্ট্রের পতনের বীজ লুকিয়েছিল । ” 

( ৪ ) রণজিৎ স্বয়ং পানাসক্ত ও ইন্দ্রিয় পরায়ণ ছিলেন । তার এই নৈতিক স্খলন তার কর্মচারীদের মধ্যে সংক্রামিত হয় এবং প্রশাসনকে আঘাত করে । বস্তুত রণজিৎ -এর শাসন ব্যবস্থা ছিল প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচারমূলক এবং জাতীয়তাবোধ দ্বারা আপ্লুত , জাতিগত সংকীর্ণতা মুক্ত উদার ও উন্মুক্ত শাসন ব্যবস্থা ।

error: Content is protected !!