টিপু সুলতানের কৃতিত্ব

টিপু সুলতানের কৃতিত্ব 

টিপু সুলতান ছিলেন মহীশূরের স্বাধীন সুলতানির প্রতিষ্ঠাতা হায়দার আলির পুত্র । টিপু নিজে বুঝেছিলেন যে সুযােগ পেলেই ক্ষমতার লােভে ইংরেজরা মহীশূরের ওপর আঘাত হানবে । তাই তিনি কোনাে মতেই সুচতুর ইংরেজকে বিশ্বাস করতেন না । ‘মহীশূরের বাঘ’ নামে পরিচিত এই শাসকটি তাই জন্মভূমি রক্ষার জন্য নিজেও তরবারি হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের মতাে প্রাণ দিয়েছিলেন ।

টিপু সুলতানের চরিত্র  

প্রকৃতপক্ষে টিপু ছিলেন শিক্ষা সম্পর্কে আগ্রহশীল , ধর্ম বিষয়ে উদার এবং সর্বোপরি বিদেশি ইংরেজ বণিকদের প্রভুত্ব থেকে দেশকে মুক্ত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ । উর্দু , ফরাসি , কানাড়ি প্রভৃতি ভাষায় তাঁর যথেষ্ট পাণ্ডিত্য ছিল । তাঁর সুবৃহৎ ও সমৃদ্ধ গ্রন্থগারটি টিপুর বিদ্যানুরাগের প্রমাণ বহন করে । ঐতিহাসিক উইলকস ( Wilks ) তাঁকে যুক্তিহীন ভাবে ‘ ধর্মান্ধ হিন্দু বিদ্বেষী ’ বলে অভিহিত করেছেন । আসলে তিনি ছিলেন ধর্মভীরু । নিজ ধর্মের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ । কিন্তু অকারণে তিনি কোনো অ-মুসলমানকে ধর্মান্তরিত করা বা খ্রিস্টানদের বিতাড়িত করেননি । কেবল রাজনৈতিক কারণে কোনো কোনো বিদ্রোহী জমিদারকে ধর্মান্তরিত করেছিলেন । পিতার মতো তিনিও হিন্দু পণ্ডিত ও দেবমন্দিরের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন । বহু হিন্দুকে তিনি উচ্চপদে নিয়োগ করেছিলেন ।  

রাজনীতিবিদ হিসেবেও টিপু বহু দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন । কূটকৌশলেও তিনি কম পারদর্শী ছিলেন না । স্বার্থান্বেষী ও সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ বণিকের আনুগত্য স্বীকার করে রাজভোগের সুখ তিনি কখনোই চাননি । তাই মারাঠা , নিজাম প্রমুখ অন্যান্য ভারতীয় শক্তিগুলির ষড়যন্ত্র ও ইংরেজ খোশামোদকারী সত্ত্বেও টিপু ইংরেজের ক্ষমতা বিস্তার রোধে স্থির ছিলেন । যোদ্ধা হিসেবে তিনি ছিলেন তেজস্বী ও পারদর্শী । শত্রুনিধনে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শক্তি ও কৌশলের সমন্বয় করেছিলেন । ফ্রান্স , মরিশাস , কাবুল প্রভৃতি দেশে প্রতিনিধি প্রেরণ করে তিনি সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে সুবিবেচনা ও অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় দেন । ফরাসি জ্যাকোবিন ক্লাবের সদস্য হয়ে তিনি ইংরেজের ভীতির কারণ সৃষ্টি করতে সফল হয়েছিলেন । 

প্রশাসনিক দক্ষতা

কেবল সুযোদ্ধা কূটকৌশলী নয় , প্রশাসক হিসেবেও টিপু সুলতান স্থায়ী কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন । তাঁর শাসন ব্যস্থায় সুলতানের ক্ষমতা ছিল অবাধ । কিন্তু তখন প্রায় সব দেশেই রাজতন্ত্র ছিল স্বৈরাচারী । তাই এজন্য টিপুকে দোষারোপ করা যায় না । তবে তাঁর শাসন কখনোই স্বেচ্ছাচারিতার পর্যায়ে নেমে যায়নি । নানাবিধ সংস্কার প্রবর্তন করে তিনি মহীশূর রাজ্যের আর্থিক ভিতকে সুদৃঢ় করে তোলেন । 

ভূমি রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য ও নিয়মিতকরণের জন্য তিনি একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন । তিনি সেচ ও অসেচ জমির রাজস্বের তারতম্য করেন । অসেচ এলাকায় রাজস্বের পরিমাণ ছিল উৎপন্ন শস্যের এক-তৃতীয়াংশ । কোনো কৃষককে নিয়মিত চাষ আবাদ ও কর প্রদান করলে তাকে কোনো কারণেই জমি থেকে উৎখাত করা হত না । অবশ্য এর ব্যতিক্রম হলে জমি হস্তান্তরিত করা হত ।  

তিনি সেচ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি ঘটান । অনাবাদী জমি উন্নয়নের জন্য চাষিদের নানাভাবে উৎসাহিত ও সরকারি সাহায্য দানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল । কোনো কোনো অঞ্চলে নগদে রাজস্ব গ্রহণের ব্যবস্থা ছিল । ধান , গম প্রভৃতি প্রধান খাদ্য শস্য ছাড়াও টিপুর আমলে আখ , সুপারি , বার্লি , চন্দন কাঠ প্রভৃতির চাষে উৎসাহিত করা হত ।  

সামগ্রিকভাবে বলা যায় , টিপুর রাজস্ব প্রশাসন ছিল যুক্তি নির্ভর ও ভারসাম্য যুক্ত । স্যার জন শোর টিপুর রাজস্ব ব্যবস্থার প্রশংসা করে বলেছেন , “ টিপুর শাসনাধীনে মহীশূরের কৃষক সম্প্রদায়কে সর্বতোভাবে রক্ষা করা হত এবং কৃষিকাজে সর্বদা সরকারি প্রেরণা প্রদান করা হত । 

আর্থিক সংস্কার 

শিল্প বাণিজ্যের প্রসারেও টিপুর আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিল । ইউরোপীয় বণিকদের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি শিল্প সম্প্রসারণে আগ্রহী হন । এজন্য তিনি কুচ , ওলমুজ , মাস্কট প্রভৃতি স্থানে একাধিক শিল্প কারখানা স্থাপন করেন । এখানে উৎপাদিত সামগ্রী পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে রপ্তানি করা হত । আমদানি করা হত মুক্তা , তামা , চিনামাটির দ্রব্যদি , গুটিপোকা প্রভৃতি ।  

ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নয়নের জন্য টিপু একটি ‘ বাণিজ্য সংস্থা ‘ গঠন করেন । বিভিন্ন বিনিয়োগকারীকে উচ্চহারে লভ্যাংশ দানের ব্যবস্থা করা হয় । চিন , ফ্রান্স , তুরস্ক , ইরান প্রভৃতি দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য তিনি ওইসব দেশে রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করেন । টিপু পেগুর সাথে একটি বাণিজ্য চুক্তিও স্বাক্ষর করেছিলেন । শিল্প বাণিজ্যের সম্প্রসারণের জন্য তিনি বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শগ্রহণে কুণ্ঠিত ছিলেন না ।  

এইভাবে নানাবিধ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে টিপুর সময়ে মহীশূর শিল্প বাণিজ্যে যথেষ্ট উন্নতি লাভ করেছিল । টিপুর শাসনাধীন মহীশূরের সার্বিক উন্নয়নের কথা স্মরণ করে প্রখ্যাত পণ্ডিত জেমস্ মিল বলেছেন , “ তাঁর শাসনাধীনে মহীশূর ছিল ভারতবর্ষের সবচেয়ে সুশাসিত অঞ্চল এবং সেখানকার অধিবাসীর ছিল সবচেয়ে সম্পন্ন । ” তাই বলা যায় , ব্যক্তিত্ব ও কৃতিত্বের ফলে টিপু সুলতান ভারত ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল স্থান অধিকার করে আছেন ।

সমালোচনা

পিতা হায়দার আলির মতো পুত্র টিপু সুলতানও ইংরেজ ঐতিহাসিকদের পক্ষপাতমূলক বিদ্বেষপূর্ণ সমালোচনার শিকার হয়েছেন । অবশ্য কোনো কোনো সৎ ঐতিহাসিক সত্য প্রচার করতে কুণ্ঠিত হননি । অন্ধ জাতীয়বাদী লেখক রবার্টস( P. E. Roberts ) টিপুকে ‘ নৃশংস , বর্বর ’ বলে অভিহিত করেছেন । গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিশ তাঁকে ‘ অসভ্য ‘, ‘উন্মাদ ‘ আখ্যা দিয়েছেন । ওয়েলেসলি টিপুকে ‘ মানব জাতির শত্রু ‘ , বলতেও কুণ্ঠিও হননি । এমনকি আলফ্রেড লায়ালও টিপুকে ‘ দুর্ধর্ষ ‘,‘ ধর্মোন্মত্ত ‘, ‘ অশিক্ষিত মুসলমান ’ বলে অভিহিত করেছেন । 

অপরদিকে , কোনো কোনো ঐতিহাসিক নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও টিপুর প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছেন । স্যার জন ম্যারিয়ট -এর ভাষায় , “ …তাঁর ( টিপুর ) জীবন ও চরিত্রে এমন অনেক কিছু ছিল যা শ্রদ্ধা ও প্রশংসার উদ্রেক করতে পারে । … তিনি সর্বদা সাহস , আন্তরিকতা ও কৌশলের পরিচয় দিয়েছেন । তাঁর পরাজয়ে আনন্দিত হয়েও সেই পরাজয় এড়ানোর জন্য তাঁর উজ্জ্বল প্রচেষ্টাকে শ্রদ্ধা করা যায় । ”

error: Content is protected !!