নানা সাহেব এর কৃতিত্ব

নানা সাহেব এর কৃতিত্ব

প্রথম বাজীরাও -এর মৃত্যুর পর পেশোয়া হন তাঁর অষ্টাদশ বর্ষীয় পুত্র বালাজী বাজীরাও । তিনি নানা সাহেব নামেও পরিচিত ছিলেন । এই সময় থেকেই শাহুর উইল অনুযায়ী মারাঠা রাজ্যের সর্বময় কর্তৃত্ব পেশোয়ার উপর ন্যস্ত হয় । অবশ্য শিবাজীর বংশধরদের মধ্য থেকে রাজার মনোনয়নের ব্যবস্থা চালু ছিল । পিতার মতো প্রতিভাবান তিনি ছিলেন না । পূর্বসূরিদের যে চারিত্রিক দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা পেশোয়াতন্ত্রের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছিল , বালাজী বাজীরাও -এর মধ্যে তার একান্ত অভাব ছিল । অবশ্য কিছুটা বিলাসী বা আরামপ্রিয় হলেও তাঁকে ঠিক অযোগ্য বলা যায় না ।

তিনি নিজে যোদ্ধা ছিলেন না । তাই যুদ্ধ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে অন্যের উপর নির্ভর করতেন। এই কারণে সিন্ধিয়া , হোলকার প্রমুখ মারাঠা সর্দাররা স্বাভাবিক কারণেই কিছুটা কর্তৃত্ব করার সুযোগ পেয়েছিলেন , যা পেশোয়ার কর্তৃত্বের বিরোধী ছিল । তা ছাড়া , ছত্রপতি শাহু মারা যাওয়ার ফলে পেশোয়ার উপর মারাঠা রাষ্ট্রের পূর্ণ কর্তৃত্ব ন্যস্ত হয়েছিল । এরফলে পেশোয়ার মর্যাদা বাড়লেও , ছত্রপতি শাহুর মৃত্যু মারাঠা রাষ্ট্রসংঘের ঐক্যবন্ধনে যে ফাটল সৃষ্টি করেছিল , তা মেরামত করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল ।

পেশোয়া নীতির পরিবর্তন

মুঘল , নিজাম , শিখ , মহীশূর প্রভৃতি শক্তিকে আঘাত হেনে মারাঠা আধিপত্য বিস্তারে নানা সাহেব যথেষ্ট সাফল্যের পরিচয় দেন । তবে তিনি পূর্ববর্তী পেশোয়াদের থেকে কয়েকটি নীতির পরিবর্তন করেন । যেমন—

( ১ ) তিনি প্রথম বাজীরাও -এর হিন্দু পাদ পাদশাহী আদর্শ ত্যাগ করেন । তাঁর বাহিনী হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সমস্ত অ-মারাঠি রাজ্যগুলিতে আক্রমণ ও লুঠতরাজ চালাতে থাকে । ফলে বহু হিন্দু শক্তি মারাঠাদের শত্রুতে পরিণত হয়

( ২ ) হিন্দু জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করার জন্য পূর্ববর্তী পেশোয়া মারাঠা বাহিনীতে কেবল হিন্দুদের নিয়োগের নীতি চালু করেছিলেন । কিন্তু বালাজী তাঁর বাহিনীতে মুসলমান ও ইউরোপীয়দের নিয়োগ করেন । ফলে মারাঠা বাহিনীর ঐক্যবোধ ও সংহতি নষ্ট হতে শুরু করে ।

( ৩ ) বালাজী মারাঠা যুদ্ধরীতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনেন । ইতিপূর্বে মারাঠা বাহিনী ‘ গেরিলা পদ্ধতিতে ’ যুদ্ধ করত । কিন্তু এখন থেকে তারা আধুনিক যুদ্ধরীতি রপ্ত করতে শুরু করে ।

উড়িষ্যা বিজয়

বালাজী বাজীরাও বা নানা সাহেবের নেতৃত্বে মারাঠা শক্তি দক্ষিণ ও মধ্য ভারতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল । মালব , গুজরাট ও বুন্দেলখণ্ডে মারাঠা আধিপত্য দৃঢ়ভাবে স্থাপিত হয়েছিল । উড়িষ্যা ও বাংলাতেও বার বার আক্রমণ চালিয়ে মারাঠাগণ অর্থ উপার্জন করেছিল । উড়িষ্যা থেকে চৌথ আদায়ের অধিকার দখল করেছিল । মহীশূর সহ দাক্ষিণাত্যের আরও কয়েকটি রাজ্য মারাঠা প্রভুত্ব স্বীকার করে নিয়ে নজরানা দিতে স্বীকৃত হয়েছিল ।

উদ্গীর যুদ্ধ

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে উদ্গীর-এর যুদ্ধে নিজামকে পরাজিত করে নানা সাহেব অসিরগড় দুর্গসহ বেশ কয়েকটি সম্পদশালী অঞ্চল লাভ করেন । অতঃপর গঙ্গা নদীর তীর ও রাজপুতানার মধ্য দিয়ে মারাঠাগণ দিল্লিতে প্রবেশ করে এবং মারাঠাদের মনোনীত ইমাদ-উল–মুলক -কে উজির পদে নিয়োগ করতে সম্রাটকে বাধ্য করেন ( ১৭৫২ খ্রিঃ ) । নব নিযুক্ত উজির মারাঠাদের হাতের পুতুলে পরিণত হন । বস্তুত দিল্লির উপর মারাঠা কর্তৃত্ব মজবুত হয়ে যায় ।

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ

এই সময়ে পাঞ্জাবে আফগান সর্দার আহমদ শাহ আবদালি’র প্রতিনিধি শাসন করতেন । দিল্লি দখল করেই মারাঠা বাহিনী পাঞ্জাব দখল করে নেয় । এরফলে মারাঠাদের ঔদ্ধত্যে ক্রুদ্ধ হয়ে তাদের শাস্তি দেবার উদ্দেশ্যে আবদালি আবার ভারত আক্রমণে উদ্যত হন । চতুর আবদালি রোহিলাখণ্ডের নাজিম উদ দৌলা, অযোধ্যার সুজাউদ্দৌলা এবং শিখ , রাজপুত , জাঠ -সহ কয়েকটি ভারতীয় শক্তিকে হয় মিত্রতা অথবা নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ করে মারাঠাদের মিত্রহীন করে দেন । ‘ পানিপথ ’ নামক স্থানে মারাঠা বাহিনীর সঙ্গে আবদালির যুদ্ধ শুরু হয় ( ১৭৬১ খ্রিঃ ) । যুদ্ধে মারাঠা বাহিনী সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয় । অসুস্থ পেশোয়া বালাজী বাজীরাও বা নানা সাহেব এই পরাজয়ের সংবাদে প্রাণত্যাগ করেন ।

error: Content is protected !!