পেশোয়া প্রথম বাজিরাও এর কৃতিত্ব

পেশোয়া প্রথম বাজিরাও এর কৃতিত্ব

১৭২০ খ্রিস্টাব্দে বালাজী বিশ্বনাথের মৃত্যু হলে পরবর্তী পেশোয়া হন তারই পুত্র প্রথম বাজীরাও । ভারতে মারাঠা শক্তি বিস্তারের ক্ষেত্রে প্রথম বাজীরাও বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন । তিনি ছিলেন সুদক্ষ যোদ্ধা , চতুর রাজনীতিবিদ এবং উচ্চাভিলাষী । গেরিলা যুদ্ধে তিনি ছিলেন বিশেষ দক্ষ । তিনিই সর্বপ্রথম বৃহৎ হিন্দু সাম্রাজ্য ( হিন্দু পাদ পাদশাহি ) গঠনের পরিকল্পনা করেন । ক্ষয়িষ্ণু মুঘল সাম্রাজ্যকে ধূলিসাৎ করে মারাঠা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা যে অসম্ভব নয়— তিনি এই ধারণা প্রচার করেন । প্রথম বাজীরাও বলতেন , “ গাছ যখন শুকিয়ে আসছে , তখন গুঁড়িতে ঘা দিলেই তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে বাধ্য । ” এই ধারণা অনুযায়ী তিনি কৃষ্ণা থেকে সিন্ধু পর্যন্ত মারাঠা পতাকা উড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন ।

উত্তর ভারত অভিযান

বাজীরাও দাক্ষিণাত্যে মারাঠা কর্তৃত্ব বজায় রাখার সাথে সাথে উত্তর ভারতেও মারাঠা কর্তৃত্ব মজবুত করতে যত্নবান হন । প্রথম পর্যায়ে তিনি চৌথ দাবি করে মালব আক্রমণ করেন ( ১৭২২ খ্রিঃ ) । মালবের মুঘল শাসনকর্তা পরাজিত হয়ে মারাঠাদের চৌথ আদায়ের অধিকার অর্পণ করেন । অতঃপর তিনি বুন্দেলা অধিপতি ছত্রশালের সাথে মিত্রতা করেন এবং ছত্রশালের পক্ষে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেন ( ১৭২৮ খ্রিঃ ) । মারাঠা আক্রমণে সম্পূর্ণ পরাজিত হয়ে মুঘল শাসক বুন্দেলখণ্ড ছেড়ে পালিয়ে যান । ছত্রশাল কৃতজ্ঞতা স্বরূপ পেশোয়াকে ‘ চৌথ ’ প্রদান করতে রাজি হন এবং রাজবংশের কিছুটা পেশোয়াকে দান করেন । এরপর তিনি গুজরাট থেকে জোরপূর্বক ‘ চৌথ ’ ও ‘ সরদেশমুখী ’ আদায় করতে থাকেন ।

ওয়ার্নার চুক্তি

পেশোয়া হিসেবে বাজীরাও -এর আর একটি কৃতিত্ব হল মারাঠাদের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটানো । তিনি বিচক্ষণতা ও তৎপরতার সাথে শম্ভুজীর সাথে ‘ ওয়ার্নার চুক্তি ’ ( ১৭৩১ খ্রিঃ ) স্বাক্ষর করেন । এই চুক্তি দ্বারা সাতারা ও কোলাপুরের বিরোধের নিষ্পত্তি হয় । মারাঠা সাম্রাজ্য শাহু ও শম্ভুজীর মধ্যে ভাগ হয়ে যায় ।

নিজাম এর পরাজয়

উত্তর ভারতের গঙ্গা বিধৌত অঞ্চল এবং কাশী , প্রয়াগ , গয়া প্রভৃতি হিন্দু তীর্থস্থানগুলি দখল করার জন্য তিনি মারাঠা সর্দারদের ধর্মীয় অনুপ্রেরণা দেন । ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে বাজীরাও দিল্লি অভিমুখে রওনা হন । পেশোয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধিতে আকাঙ্ক্ষিত হয়ে মুঘল সম্রাট নিজামের সাহায্য প্রার্থনা করেন । নিজাম পেশোয়ার সাথে পূর্ব স্বাক্ষরিত ( ১৯৩১ খ্রিঃ ) ‘ মৈত্রী চুক্তি ‘ অগ্রাহ্য করে মুঘলদের সাহায্যে অগ্রসর হন । পেশোয়া ভূপালের সন্নিকটে নিজামকে আক্রমণ করেন ও তার বাহিনীকে ধ্বংস করেন । 

দোহরা সরাই’ -এর সন্ধি ( ১৭৩৮ খ্রিঃ ) দ্বারা মারাঠাগণ নর্মদা ও চম্বল নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল অধিকার এবং ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫০ লক্ষ টাকা লাভ করে । অতঃপর তিনি পশ্চিম উপকূলে সলসেট ও বেসিন থেকে পোর্তুগিজদের বিতাড়িত করেন ( ১৭৩৯ খ্রিঃ ) । এই সময়ে নাদির শাহ কর্তৃক ভারত আক্রমণের সম্ভাবনা দেখা দিলে প্রথম বাজীরাও প্রতিবেশী মুসলমান শাসকদের সাথে শান্তি স্থাপন করে ঐক্যবদ্ধভাবে বিদেশি নাদিরকে প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত হন । কিন্তু এই সময়েই তাঁর মৃত্যু হয় ( ১৭৪০ খ্রিঃ ) ।

কৃতিত্ব বিচার

প্রথম বাজীরাও তাঁর অনন্য সাধারণ প্রতিভা দ্বারা মারাঠা রাজ্যকে একটা নির্দিষ্ট স্তরে উন্নীত করেছিলেন — এ বিষয়ে দ্বিমত নেই । রিচার্ড টেম্পল- এর মতে , আরবসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল ছিল তাঁর ভয়ে কম্পিত । মাত্র ২০ বছরের চেষ্টায় তিনি মারাঠা রাজ্যকে একটা শক্ত ভিতের উপর স্থাপন করেছিলেন । মারাঠা ঐতিহাসিক সরদেশাই’ও এই কারণে বাজীরাও এর প্রশংসা করে তাকে “ বৃহত্তর মহারাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ” বলে আখ্যায়িত করেছেন ।  

কয়েকটি কারণে প্রথম বাজীরাও -এর পরিকল্পনা সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে । তিনি উত্তর ভারতের মারাঠা প্রভুত্ব বিস্তারে কিছুটা সফল হলেও , তা সামগ্রিকভাবে মারাঠা সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বকে দৃঢ় করতে পারেনি । কারণ দীর্ঘকাল উত্তর ভারতে যুদ্ধে লিপ্ত থাকার ফলে দাক্ষিণাত্যে নিজাম নিজেকে শক্তিশালী করে তোলে এবং মহীশূরে হায়দার আলির নেতৃত্বে নতুন শক্তির বিকাশ সম্ভব হয়েছিল । এমনকি তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে নাগপুরে ভোঁসলে , গোয়ালিয়রে সিন্ধিয়া , ইন্দোরে হোলকার প্রভৃতি মারাঠা সর্দার ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন এবং কেন্দ্রীয় শক্তির নেতৃত্ব অস্বীকার করতে শুরু করেন । ফলে মারাঠা সাম্রাজ্যের সংহতি দ্রুত নষ্ট হতে থাকে । বস্তুত যোদ্ধা হিসেবে বাজীরাও দক্ষতা সম্পন্ন হলেও সংগঠক হিসেবে যথার্থ যোগ্যতা তাঁর ছিল না । তাই আচার্য যদুনাথ সরকার  বলেছেন : “ The Peswa’s work was that of a conqueror , not that of a consolidator . He was a matchless cavalry leader but no states man , no farsighted reformer . “

error: Content is protected !!