পেশোয়া তন্ত্র কী

পেশোয়া তন্ত্র কী

মুঘল সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের উপর যে সকল আঞ্চলিক শক্তির উদ্ভব ঘটেছিল , তাদের মধ্যে মারাঠা শক্তি ছিল সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য । মারাঠা বীর ছত্রপতি শিবাজী মারাঠা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে যে মারাঠা রাজ্যের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিলেন , তাঁর মৃত্যুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তা বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল । কিন্তু সাময়িক বিরতির পর মারাঠা শক্তি আবার পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল । এই উত্থানের প্রধান নায়ক ছিলেন কয়েকজন পেশোয়া বা প্রধানমন্ত্রী ।  

শিবাজীর সময়েও পেশোয়া পদ ছিল , কিন্তু তা ছিল ছত্রপতির ছত্রছায়ায় ঢাকা । শিবাজীর মৃত্যুর পর মারাঠা রাষ্ট্রসংঘে যে ভাঙন এসেছিল , আপন আত্মত্যাগ , প্রেরণা ও কর্মদক্ষতা দ্বারা কয়েকজন পেশোয়াই তাকে আবার সজীব ও সচল করে তোলেন । ক্রমে মারাঠা রাষ্ট্রসংঘে পেশোয়ারাই রাষ্ট্রের প্রধান চালকে পরিণত হন , রাজা চলে যান তাঁর আড়ালে । মারাঠা ইতিহাসে এই কালটি ‘ পেশোয়াদের যুগ ’ নামে পরিচিত ।

শিবাজীর মৃত্যুর ( ১৬৮০ খ্রিঃ ) সময় তাঁর পৌত্র শাহু ঔরঙ্গজেবের বন্দি হিসেবে মুঘল কারাগারে আটক ছিলেন । সাথে তাঁর মা-ও ছিলেন । কিন্তু ঔরঙ্গজেব তাঁদের প্রতি যথেষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করতেন । তারা সসম্মানে ও স্ব-অধিকারে মুঘল দরবারে অবস্থান করেছিলেন । ঔরঙ্গজেবের ইচ্ছা ছিল শাহুকে প্রভাবিত করে মারাঠা-মুঘল বিরোধিতার অবসান ঘটানো । কিন্তু ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে অকস্মাৎ ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায় ।

 

মুঘল রাজনীতি

এদিকে শিবাজীর মৃত্যু , মুঘলদের হাতে শম্ভুজীর হত্যা এবং শাহুর বন্দিদশায় হতাশ না হয়ে মারাঠাদের মুঘল বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব তুলে নেন শিবাজীর কনিষ্ঠ পুত্র রাজারাম । রাজারামের মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা পত্নী তারাবাঈ নিজ শিশুপুত্রকে ‘ দ্বিতীয় শিবাজী ‘ আখ্যা দিয়ে সিংহাসনে বসান এবং নিজে তাঁর অভিভাবক রূপে শাসন পরিচালনা করতে থাকেন । এমতাবস্থায় মুঘল উজির জুলফিকার খান’র পরামর্শে শাহুকে মুক্তি দিয়ে মহারাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ( ১৭০৭ খ্রিঃ ) । বিচক্ষণ জুলফিকারের উদ্দেশ্য ছিল শাহু মহারাষ্ট্রে উপস্থিত হলে মারাঠা সিংহাসনকে কেন্দ্র করে গৃহ যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হবে এবং তাহলে মারাঠাদের মুঘল বিরোধিতাও হ্রাস পাবে ।  

শাহুর মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে মারাঠাদের গৃহ বিবাদ শুরু হয় । তারাবাঈ শাহুর দাবিকে নস্যাৎ করে দেন । তিনি শাহুকে অসাধারণ এবং মুঘলদের প্রতিনিধি বলে বর্ণনা করে দাবি করেন যে , শিবাজী মহারাজের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রাজারামই শিবাজীর অসমাপ্ত কাজ হাতে তুলে নিয়ে বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেছেন । তাই মারাঠা সিংহাসনে বৈধ দাবিদার রাজারামের বংশধর ।  

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে , শাহু ব্যক্তিগতভাবে শিবাজীর জীবনধারা ও আদর্শের অনুরাগী ছিলেন না । দীর্ঘকাল মুঘল আতিথ্যে বাস করার ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি তাঁর এক ধরনের আনুগত্য জন্মেছিল । কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তিনি মুঘল বিরোধিতার নীতি ত্যাগ করেন । স্বভাবতই এক শ্রেণির মারাঠা নেতা শাহুকে সমর্থন করতে দ্বিধান্বিত হন । যাই হোক , ‘ খেদের যুদ্ধে ’ ( ১৭০৭ খ্রিঃ ) শাহু তারাবাঈকে পরাজিত করতে সক্ষম হন এবং সাতারার সিংহাসন দখল করেন , তারাবাঈ কোলাপুরে ঘাঁটি করে শাহুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন ।

ওয়ার্মার সন্ধি

এই গৃহযুদ্ধ এবং মারাঠা সর্দারদের একাংশের বিরূপতায় শাহু কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন । প্রাথমিক পর্বে জয়লাভ করলেও তারাবাঈ তাকে যথেষ্ট শংকিত করে রাখে । শাহুর সেনাপতি চন্দ্রজিৎ যাদব এবং প্রখ্যাত মারাঠা সর্দার কানোজী আংরে প্রমুখ তারাবাঈ -এর পক্ষ নিলে শাহু দারুণ ভেঙে পড়েন । তাঁর এই বিপদের মুহূর্তে তিনি পেশোয়া বালাজী বিশ্বনাথের সার্বিক সহায়তায় আবার আশার আলো দেখতে পান । বিশ্বনাথের বিচক্ষণতার ফলে অধিকাংশ মারাঠা সর্দার শাহুর পক্ষে যোগ দেন । এদিকে দ্বিতীয় শিবাজীর মৃত্যু ঘটলে , তারাবাঈও মারাঠা সিংহাসনের জন্য লড়াই করার প্রেরণা হারিয়ে ফেলেন । শেষ পর্যন্ত পেশোয়া প্রথম বাজীরাও এর উদ্যোগে উভয় পক্ষের মধ্যে ‘ ওয়ার্মার চুক্তি ’ ( ১৭৩১ খ্রিঃ ) স্বাক্ষরিত হলে মারাঠা গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে ।

পেশোয়া তন্ত্র উত্থানের কারণ

বস্তুত মারাঠা রাষ্ট্রে ‘ পেশোয়াতন্ত্রের ‘ উত্থান খুব অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয় । মারাঠাদের রাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য ছিল না । শিবাজী ব্যক্তিগত দক্ষতা স্বরূপ মারাঠা রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । তাঁর অধিষ্ঠিত জীবনে মারাঠা জনসাধারণের মনে গভীর রাজানুগত্য সৃষ্টি করা বা বিশেষ বংশের প্রতি আনুগত্য সৃষ্টি করা সম্ভব ছিল না । স্বভাবতই যে-কোনো বিচক্ষণ , ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ও কর্মদ্যোগী মানুষের নেতৃত্বে উত্থানের পথ ছিল উন্মুক্ত । সরকারি পদাধিকারী হিসেবে পেশোয়াদের উত্থানটা ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ ।  

শাহু ব্যক্তিগতভাবে সমরবিদ্ ছিলেন না , কিন্তু গুণীর কদর করতে জানতেন । পেশোয়া বালাজী বিশ্বনাথের বিশ্বস্ততা ও জাতীয়তাবোধ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল । তাই তিনি ধীরে ধীরে পেশোয়ার হাতে সমস্ত ক্ষমতা তুলে দিতে দ্বিধা করেননি । ছত্রপতির সঙ্গে পেশোয়ার তুলনা করে ড. সুরেন্দ্রনাথ সেন ছত্রপতিকে ‘ জাপানের মিকাডো ’ এবং পেশোয়ারকে ‘ সোগুনের প্রতিচ্ছবি ‘ বলে উল্লেখ করেছেন । পেশোয়া পদে ছত্রপতির অনুমোদন ছিল আবশ্যিক , কিন্তু পেশোয়ার কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ছত্রপতির ছিল না ।  

যাই হোক , শাহু শেষ জীবনে উইল দ্বারা পেশোয়ার পদকে বংশানুক্রমিক এবং কার্যকরী মুখ্য প্রশাসকে পরিণত করে প্রতিভাকেই সম্মানিত করেছেন । অবশ্য এই ব্যবস্থার শেষ পরিণতি খুব ভালো হয়নি ।

error: Content is protected !!