রবার্ট ক্লাইভ

রবার্ট ক্লাইভ

ভারতে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তৃত্ব স্থাপনে রবার্ট ক্লাইভের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । মাত্র উনিশ বৎসর বয়সে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামান্য কেরানি হিসেবে তিনি মাদ্রাজে আসেন । কিন্তু অসীম সাহস , অদম্য উৎসাহ , তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও দূরদৃষ্টির দ্বারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি সামরিক কর্মচারী হিসেবে নিজের মর্যাদা যেমন বৃদ্ধি করেন , তেমনি বৃদ্ধি করেন কোম্পানির খ্যাতি ও প্রতিপত্তিকে ।

কলিকাতা বিজয়

মাদ্রাজে ইংরেজদের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ফরাসিগণ । কিন্তু ক্লাইভ নিজস্ব নতুন রণকৌশল প্রয়োগে কর্ণাটের দ্বিতীয় যুদ্ধে শক্তিশালী ফরাসিদের পরাজিত করেন এবং নিজ সমর্থিত প্রার্থীকে কর্ণাটের নবাব পদে বসাতে সক্ষম হন । এর ফলে ওই অঞ্চলে ইংরেজ কোম্পানি ব্যবসা বাণিজ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা লাভ করে ।  

ওই সময়ে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ইংরেজ কোম্পানির বিরেধিতা- হেতু সিরাজ ইংরেজদের কলিকাতাস্থ ঘাঁটি ফোর্ট উইলিয়াম দখল করে নেন । সিরাজের অকর্তিত আক্রমণে বহু ইংরেজ প্রাণ হারায় । এই অবস্থায় কোম্পানি ক্লাইভ ও ওয়াটসনকে মাদ্রাজ থেকে কলিকাতায় প্রেরণ করে । ক্লাইভ অল্প শ্রমেই ফোর্ট উইলিয়াম পুনর্দখল করেন । অতঃপর সিরাজ ক্লাইভের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন । কিন্তু ক্লাইভের সাহসিকতায় ভীত হয়ে তিনি ‘ আলিনগরের সন্ধি ‘ স্বাক্ষর করেন । এই সন্ধির ফলে ইংরেজগণ বিনাশুল্কে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনার ও অপরাপর কয়েকটি আর্থিক সুবিধা লাভ করেছিল ।

পলাশীর যুদ্ধ

ক্লাইভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এতেই নিবৃত্ত হল না । তিনি কোম্পানির জন্য আরও সুযোগ-সুবিধা আদায়ের জন্য সিরাজ বিরোধী এক ষড়যন্ত্রেও যোগ দিয়েছিলেন । উমিচাঁদ , জগৎশেঠ , রায়দুর্লভ , মিরজাফর প্রমুখ নবাবের উচ্চপদস্থ বহু কর্মচারী সিরাজকে মসনদ চ্যুত করতে আগ্রহী ছিলেন । মিরজাফর ছিলেন সিরাজের প্রধান সেনাপতি এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী । ক্লাইভ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার পরিবর্তে মিরজাফরকে সিরাজ বিরোধী ষড়যন্ত্রে সাহায্য করতে রাজি হয়ে এক চুক্তি সম্পাদন করলেন । অতঃপর . পলাশীর যুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী ও ইংরেজ -এর মিলিত বাহিনীর সাথে যুদ্ধে সিরাজ পরাজিত ও পরে নিহত হলে বাংলার নবাব হলেন মিরজাফর ।  

ক্লাইভ পূর্ব চুক্তি মতো প্রথমেই লাভ করলেন চব্বিশ পরগনার জমিদারি ও প্রচুর পরিমাণ অর্থ । এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবেও তিনি পেলেন বহু পারিতোষিক । ইংরেজদের দাবি মেটাতে মেটাতে বাংলার রাজকোষ হল শূন্য , কিন্তু তবুও ক্লাইভের বাসনা তৃপ্ত হল না । এই সময়ে ইংরেজদের বিতাড়িত করার উদ্দেশ্যে মিরজাফর ওলন্দাজ বণিকদের সাথে এক গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন । কিন্তু ক্লাইভের তীক্ষ্ণ নজরকে ফাঁকি দেওয়া সহজ ছিল না । তাই আগেই তিনি বিদারার যুদ্ধে ওলন্দাজদের পরাজিত করে ইংরেজদের বিপদ মুক্ত করেন ।

দেওয়ানি লাভ

বিদারার যুদ্ধের পর ( ১৭৫৯ খ্রিঃ ) ক্লাইভ ইংল্যান্ডে ফিরে যান । কিন্তু ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি পুনরায় গভর্নর রূপে ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন । ইতিমধ্যে তাঁকে ‘ লর্ড ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে । ক্লাইভের দ্বিতীয় শাসনকাল ভারতবর্ষের ইতিহাসে আরও গুরুত্বপূর্ণ । এই সময়ে তিনি উপস্থিত বুদ্ধির দ্বারা কোম্পানির ভিত্তিকে যথেষ্ট সুদৃঢ় করে তোলেন । 

বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত সম্রাট শাহ আলম , অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা বা বাংলার নবাবের রাজ্য গ্রাস করার সম্পূর্ণ সুযোগ ক্লাইভের সম্মুখে ছিল । কিন্তু দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ক্লাইভ রাজ্য গ্রাস না করে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাকে আইনগত ভিত্তিদানের ব্যবস্থা করেছিলেন । কারণ ক্লাইভ অনুধাবন করেছিলেন যে , ইংরেজগণ বাংলাদেশে ব্যবসা বাণিজ্য করলেও তাদের কোনো আইনগত অধিকার তখনও স্থাপিত হয়নি , যা একান্ত দরকার । 

দ্বিতীয়ত , তিনি সুজাউদ্দৌলার কাছ থেকে কারাএলাহাবাদ নামক দুটি স্থান ও ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ বাবদ গ্রহণ করলেন । আবার ঐ কারা ও এলাহাবাদ নামক স্থান দুটি ও বাৎসরিক ২৬ লক্ষ টাকার বিনিময়ে সম্রাট শাহ আলমের নিকট থেকে লাভ করলেন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি ( ১৭৬৫ খ্রিঃ ) ।

কোম্পানির দেওয়ানি লাভ ভারত ইতিহাসের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । এর ফলে বাংলাদেশের অর্থের মালিক হল কোম্পানি , আর নবাব অর্থের জন্য নির্ভরশীল থাকলেন কোম্পানির দয়ার উপর । শুধু তাই নয় , সুচতুর ক্লাইভ ‘ দেওয়ানি ’ লাভ করেও কিন্তু দেওয়ানি পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজেদের হাতে রাখলেন না । কারণ তখন বাংলার দেওয়ানি সংক্রান্ত কোনো কাজই কোম্পানির জানা ছিল না । তাই ক্লাইভ দেওয়ানি রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত সমস্ত কাজই ন্যস্ত করেছিলেন নবাবের কর্মচারীর হস্তে । ইতিহাসে এই ঘটনাই ‘ দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা ‘ নামে খ্যাত ।

শাসন সংস্কার

কোম্পানির অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে পরিচালন কাঠামো শক্তিশালী করার বিষয়েও ক্লাইভ সময়োচিত দৃঢ়তা দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন । তিনি দ্বিতীয়বার ভারতে এসে দেখেন যে , কোম্পানির কর্মচারীবর্গের অধিকাংশই দুর্নীতিগ্রস্ত । কোম্পানির চাকুরির সাথে সাথে তার ব্যক্তিগত বাণিজ্যে লিপ্ত থেকে প্রচুর মুনাফা লাভে ব্যস্ত । এর ফলে একদিকে যেমন কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি হচ্ছিল , তেমনি দুর্বল হয়ে পড়ছিল কোম্পানির শাসনযন্ত্র । ক্লাইভ দৃঢ় হস্তে এইসব দুর্নীতির মোকাবিলা করেছিলেন । এজন্য তিনি ‘ সিলেক্ট কমিটি ‘ নামে একটি সমিতি গঠন করে সামরিক-বেসামরিক সব দায়িত্ব নিজহস্তে গ্রহণ করলেন । 

 কোম্পানির কর্মচারীদের পারিতোষিক গ্রহণ , ব্যক্তিগত বাণিজ্যে লিপ্ত হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন এবং কাউন্সিলের দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্যদের হয় অবসর গ্রহণে বাধ্য করলেন নতুবা অপসৃত করলেন । অবশ্য কর্মচারীদের অসন্তোষ দূর করার জন্য তাদের বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থাও ক্লাইভ করেছিলেন ।

কোম্পানির সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্যও ক্লাইভ কতকগুলি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন ।

এইভাবে ক্লাইভ তার ভারতে অবস্থার কালে বিবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ দ্বারা কোম্পানির সামরিক , শাসনতান্ত্রিক ও আর্থিক অবস্থার বহুল উন্নয়ন সাধন করেন । তার বহু কাজ নিরপেক্ষ দৃষ্টির বিচারে অবশ্যই অযৌক্তিক ছিল , কিন্তু এদেশে কোম্পানির ভিত্তিকে সুদৃঢ় করার ব্যাপারে সেগুলি ছিল অনিবার্য ।

error: Content is protected !!