নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর কৃতিত্ব

নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর কৃতিত্ব

সুলতানি আমলে মাঝে মাঝে বাংলার উপর দিল্লির কর্তৃত্ব স্থাপিত হলেও অধিকাংশ সময় বাংলা ছিল দিল্লির প্রভাব মুক্ত । মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে বাংলাদেশ মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিল । সেই সময় থেকে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু পর্যন্ত ( ১৭০৭ খ্রিঃ ) বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে মুঘল শাসনাধীন ছিল । সম্রাট নিযুক্ত সুবাদারগণ অন্যান্য প্রদেশের মতো বাংলাদেশ শাসন করতেন ।  

কিন্তু দিল্লি থেকে বাংলার দূরত্ব বাংলার স্বাধীন ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক পরিবেশ বাংলার শাসকদের বারে বারেই স্বাধীনতাকামী করে তুলেছে । ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে বাংলাদেশ আইনত মুঘল প্রভুত্ব স্বীকার করলেও কার্যক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্বাধীনতা ভোগ করতে থাকে । ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলাদেশের সুবাদার নিযুক্ত হলে বাংলার স্বাধীন নবাবির সূচনা হয় ।

ক্ষমতায় উত্তরণ

হায়দ্রাবাদের দেওয়ান রূপে মুর্শিদকুলি খাঁ তার কর্মজীবন শুরু করেন । তার কর্মদক্ষতায় ও সততায় মুগ্ধ হয়ে সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাকে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার ‘ দেওয়ান ’ পদে নিযুক্ত করেন । সেই সময় বাংলার সুবাদার ছিলেন ঔরঙ্গজেবের পুত্র আজিম উস সান । সুবাদার ছিলেন শাসন বিভাগের প্রধান এবং দেওয়ান ছিলেন রাজস্ব বিভাগের প্রধান । দেওয়ান তাঁর কাজের জন্য একমাত্র সম্রাটের নিকট জবাবদিহি করতে বাধ্য ছিলেন । আজিম বৈধ অবৈধ উপায়ে অর্থ সংগ্রহের পক্ষপাতী ছিলেন । এজন্য দরিদ্র চাষি কৃষকদের উপর জুলুম করতেও তিনি দ্বিধা করতেন না । 

 কিন্তু মুর্শিদকুলি খাঁ সুবাদার কর্তৃক অবৈধ অর্থোপার্জন বন্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন । ফলে সুবাদারের সাথে তার তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয় । এমতাবস্থায় সুবাদারের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীন দেওয়ানি পরিচালনার উদ্দেশ্যে ‘ দেওয়ান ‘ – এর প্রধান কার্যালয় ঢাকা থেকে মকসুদাবাদে স্থানান্তরিত করেন । তাঁর নামানুসারেই এই স্থানের নাম হয় ‘ মুর্শিদাবাদ ’ । ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি বাংলার সুবাদার পদে উন্নীত হন ।

মুর্শিদকুলি খাঁর ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা

মুর্শিদকুলির শাসনকাল বাংলার ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায় । তাঁর সুদক্ষ শাসনে বাংলায় রাজনৈতিক শান্তি ও নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সাধিত হয়েছিল । তিনিই প্রথম বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থাকে দুর্নীতি মুক্ত করে গতিশীল করে তুলতে উদ্যোগী হয়েছিলেন । তার কার্যভার গ্রহণকালে ভূমি রাজস্ব থেকে সরকারের আয় ছিল প্রায় শূন্য । এই ত্রুটি দূর করার জন্য তিনি দুটি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন , যথা—

( ১ ) মুঘল কর্মচারীদের প্রদত্ত সমস্ত জায়গিরকে ‘ খালিসা ’ জমিতে পরিণত করে উক্ত কর্মচারীদের অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলে জায়গির প্রদান করেন এবং

( ২ ) রাজস্ব আদায়ের ভার জমিদারদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ইজারাদার ( Contractor ) – দের হাতে ন্যস্ত করেন । রাজস্ব আদায়ের এই নতুন ব্যবস্থাই ‘মাল জামিনী‘ ( Malzamini ) নামে পরিচিত । মুর্শিদকুলি রাজ্যের সমস্ত জমি জরিপ করে উৎপাদিকা শক্তি অনুযায়ী রাজস্ব নির্ধারণ করেন । প্রতিটি জমির বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট কৃষকের নাম , ঠিকানা ও প্রদেয় রাজস্বের পরিমাণ উল্লেখ করে ‘ বিবরণ পুস্তক ‘ ( Descriptive Roll ) প্রণয়ন করেন ।

উচ্চপদে হিন্দুদের নিয়োগ

মুর্শিদকুলি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চ রাজপদগুলিতে নিজ আত্মীয় ও বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিদের নিয়োগ করলেও ভূমি রাজস্ব বিভাগের অধিকাংশ পদে তিনি হিন্দুদের নিয়োগ করেন । এর প্রধান কারণ হল , মুসলমান আদায়কারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা দিতেন না , পরন্তু দিল্লির প্রশাসনিক কর্তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতার ফলে , বাংলার নবাব তাদের শাস্তি দিতে পারতেন না । পক্ষান্তরে , হিন্দুরা ছিলেন কর্তব্যপরায়ণ এবং সহজে দমনযোগ্য

রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে মুর্শিদকুলি খুব কঠোর ছিলেন । রাজস্ব যথাযথভাবে আদায় করতে না পারলে তিনি আমিল , কানুনগো প্রভৃতি রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালাতেন । তাদের দেওয়ানখানায় বন্দি রেখে খাদ্য , পানীয় ইত্যাদি না দিয়ে কষ্ট দেওয়া হত । কখনো বা দড়িতে পা বেঁধে মাথা নীচের দিকে করে ঝুলিয়ে রাখা হত ইত্যাদি ।

সুশাসক

সলিমউল্লাহ মুর্শিদের নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচারের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন । ন্যায়বিচারের স্বার্থে নিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কেও তিনি প্রাণদণ্ড দিতে কুণ্ঠিত হতেন না । এর জন্য তাঁর আমলে দেশে আইনশৃঙ্খলা বজায় ছিল । অন্যায় কাজকর্ম খুবই হ্রাস পেয়েছিল । স্বৈরাচারী হলেও প্রজাসাধারণের মঙ্গলের প্রতি তাঁর সজাগ দৃষ্টি ছিল । খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি , মজুতদারি প্রতিরোধ , খাদ্যাভাবের সময় প্রজাদের সাহায্য দান প্রভৃতি বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন । মুর্শিদকুলির উৎসাহে ব্যবসা বাণিজ্যও যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল । নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত বাণিজ্য শুল্ক তিনি কখনও আদায় করতেন না । দেশীয় বণিকদের প্রতি তার আন্তরিক সহানুভূতি ছিল ।  

সম্রাট ফারুকশিয়ার প্রদত্ত ‘ সনদ ‘ ( Farman ) অনুযায়ী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাদেশে একাধিক বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জন করলে মুর্শিদ শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন । বাংলার ব্যবসায়ীদের বাঁচানোর জন্য তিনি নানাপ্রকার প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করে ইংরেজ বণিকদের অতিরিক্ত সুবিধা লাভে বঞ্চিত করতে চেষ্টা করেন । প্রশাসনিক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি যোগ্যতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন । তার আমলে বহু হিন্দু উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত হয়েছিল । শিক্ষা সংস্কৃতির প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল । বিভিন্ন শাস্ত্রে সুপণ্ডিত বহু ব্যক্তি পারস্য থেকে আমন্ত্রিত হয়ে মুর্শিদের দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন ।

মূল্যায়ন

মুর্শিদকুলি খাঁ’র আমলে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হলেও , তার স্থায়িত্ব ছিল না । কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে , মুর্শিদকুলি দক্ষ প্রশাসক ছিলেন ঠিকই ; কিন্তু রাষ্ট্রবিদ্ হিসেবে তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দিতে পারেননি । কিন্তু অধ্যাপক আব্দুল করিম এই অভিযোগ পুরোপুরি মানতে অস্বীকার করেছেন । তাঁর মতে , মুর্শিদকুলি হয়তো পররর্তীকালের উপযুক্ত কোনো পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারেননি । কিন্তু এজন্য তাঁকে দোষ দেওয়া সঠিক নয় । কারণ দিল্লি সুলতানির অনুগত শাসক হিসেবে তাঁর ক্ষমতা সীমাবদ্ধ ছিল । তাঁর কৃতিত্ব এইখানে যে , বহুমুখী নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থেকেও তিনি বাংলার জন্য এক স্বাধীন ও স্বতন্ত্র শাসন ব্যবস্থার সূচনা করে যেতে পেরেছেন ।

error: Content is protected !!