ভারতে ইউরোপীয় বণিকদের আগমন

ভারতে ইউরোপীয় বণিকদের আগমন

বহু প্রাচীনকাল থেকেই পাশ্চাত্য দেশগুলির সাথে ভারতের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল । ইউরোপীয় দেশগুলিতে ভারতীয় পণ্যসামগ্রীর প্রচুর চাহিদা ছিল । মধ্যযুগে ভারতের সাথে ইউরোপীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সাথে একাধিক পথে বাণিজ্য চলত । এই ব্যবসা বাণিজ্যের কাজ এশিয়া মহাদেশের মধ্যে প্রধানত আরবদেশীয় বণিক ও নাবিকদের মাধ্যমে চলত ।

অপরদিকে , ইউরোপীয় ভূখণ্ডে ও ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যে ইতালীয়দের প্রাধান্য ছিল । কিন্তু ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে অটোমান তুর্কিরা এশিয়া মাইনর ও কনস্টান্টিনোপল অধিকার করে নিলে এশিয়া ও পশ্চিম ইউরোপীয় বাণিজ্যপথ তুর্কিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় । কিন্তু এশিয়ার সাথে ব্যবসা এত লাভজনক ছিল যে , তা ত্যাগ করা পশ্চিমি দেশগুলির পক্ষে সম্ভব ছিল না । তাই তারা নতুন পথের সন্ধান করতে থাকে ।

একই সময়ে নবজাগরণের ফলে পশ্চিমি দেশগুলির নাবিকদের মনে যে উৎসাহ , উদ্দীপনা ও সাহস সঞ্চারিত হয়েছিল , নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফলে তা কার্যকারিতার দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে । সামুদ্রিক মানচিত্র , দিক নির্ণয় যন্ত্র ও উন্নতমানের নৌযান নির্মিত হবার ফলে দুঃসাহসী পশ্চিমি বণিকেরা অজানাকে জানার জন্য সমুদ্র অভিযানে বেরিয়ে পড়ে ।

ভারতে আসার নতুন জলপথ আবিষ্কার

এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল স্পেন এবং পোর্তুগালের নাবিকেরা । ১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে স্পেনীয় নাবিক কলম্বাস ভারতের জলপথ আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু করে আমেরিকা আবিষ্কার করে ফেলেন । ১৫৮৭ খ্রিস্টাব্দে পোর্তুগিজ নাবিক বার্থোলোমিউ দিয়াজ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তে উত্তমাশা অন্তরীপ ( Cape of Good Hope ) আবিষ্কার করেন । সেই পথ ধরেই আর এক পোর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা দক্ষিণ ভারতের কালিকট বন্দরে এসে উপস্থিত হন ( ১৪৯৮ খ্রিঃ ) । এই নব আবিষ্কৃত জলপথ ধরেই একে একে পোর্তুগিজ , ওলন্দাজ , ইংরেজ , ফরাসি , দিনেমার প্রভৃতি ইউরোপীয় নাবিকগণ ভারতে এসে ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করে ।

পোর্তুগিজ নাবিকদের আগমন

১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ ভারতের কালিকট বন্দরে পোর্তুগিজ বাণিজ্যপোত এসে উপস্থিত হলে ভারতে ইউরোপীয় বণিকদের আগমনের সূচনা হয় । ভাস্কো দা গামার নেতৃত্বে পোর্তুগিজরা ভারতে উপস্থিত হয় ।

ভাস্কো দা গামা :

বাণিজ্যাধিকার হাতছাড়া হবার ভয়ে আরব বণিকেরা ভাস্কো দা গামার বিরোধিতা করে । সেই সঙ্গে পোর্তুগিজদের খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের প্রচেষ্টাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করার জন্য উত্তর ভারতের মুসলিম রাজ্যগুলিও পোর্তুগিজদের বিরোধিতা করতে থাকে । যাই হোক , ভাস্কো দা গামাকালিকটের হিন্দু রাজা ‘ জামোরিন’ এর সাথে সু -সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হন । কিন্তু পোর্তুগিজ নাবিকদের নিম্নমানের দ্রব্য সামগ্রী ভারতে আগ্রহ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয় । পরস্তু পোর্তুগিজদের জলদস্যুতা ভারতীয় জনমানসে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে । তাই ভাস্কো দা গামাপ্রথম আগমনে সম্পূর্ণ সাফল্য লাভ করতে ব্যর্থ হন । অবশ্য তাঁর আংশিক সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে পোর্তুগিজরা দলে দলে ভারতে আসতে থাকে ।

পেড্রো কাব্রাল  :

১৫০০ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় পোর্তুগিজ পেড্রো কাব্রাল ত্রিশটি জাহাজ ও বারো শত সৈন্য নিয়ে কালিকটে উপস্থিত হন । তিনি জামোরিন এর অনুমত্যানুসারে কালিকটে একটি বাণিজ্যকুঠি নির্মাণের অধিকার পান । কিন্তু শীঘ্রই ‘ জামোরিন ’ – এর সাথে ক্যাব্রালের সম্পর্ক নষ্ট হয় । জামোরিন ও আরব বণিকেরা মিলিত ভাবে ক্যাব্রালকে আক্রমণ করলে তিনি কোচিনে চলে যান এবং শেষ পর্যন্ত স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হন । অবশ্য পোর্তুগিজরা বুঝতে পারে যে , এদেশের রাজাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতাকে কাজে লাগাতে পারলে নিজেদের স্বার্থপূরণ সহজতর হবে ।

১৫০২ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো দা গামাদ্বিতীয়বারের জন্য ‘ কালিকট ’ বন্দরে এসে উপস্থিত হন । এবারে ভাস্কো দা গামানৃশংস অত্যাচার দ্বারা জামোরিনকে বশীভূত করতে চাইলেন । বহু হিন্দু ও মুসলমানকে হত্যা করে তিনি কোচিনে চলে আসেন এবং সেখানে একটি বাণিজ্যকুঠি নির্মাণ করেন । এই সময় থেকে পোর্তুগিজরা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাজে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে ।

আলমিদা :

 অতঃপর পোর্তুগাল সরকার তাঁদের ভারত নীতির পরিবর্তন করেন । এদেশে অভিযান পাঠানোর পরিবর্তে একজন করে রাজ -প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন । সেই মতো ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দে তিন বছরের মেয়াদে রাজ প্রতিনিধি হিসেবে আসেন আলমিদা ( Almeida ) । তিনি ভারতে পোর্তুগিজ কুঠিগুলির নিরাপত্তার জন্য কান্নানোর ও কোচিনে কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করেন । ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনের তিনি পক্ষপাতী ছিলেন না ।

আলবুকার্ক : 

পরবর্তী প্রতিনিধি আলবুকার্ক ( ১৫০৯ খ্রিঃ ) স্থায়ী সাম্রাজ্য গঠনের লক্ষ্য নিয়েই ভারতে আসেন । সামরিক শক্তি দ্বারা গোয়া ( ১৫১০ খ্রিঃ ) , মালাক্কা ( ১৫১১ খ্রিঃ ) এবং অরমুজ ( ১৫১৫ খ্রিঃ ) দখল করে তিনি ওইসব স্থানে পোর্তুগিজ শাসনের সূচনা করেন । কালক্রমে দিউ থেকে বাংলার হুগলি পর্যন্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থান যেমন — গোয়া , দমন , দিউ , সুরাট , সলসেট , বেসিন , কোচিন , কালিকট , কুইলন , মসুলিপত্তনম প্রভৃতি পোর্তুগিজদের দখলিভূত হয় । ভারতে পোর্তুগিজ ক্ষমতা স্থাপনের প্রধান নায়ক ছিলেন আলবুকার্ক । তিনিই এদেশে পোর্তুগিজদের ক্ষমতা সুদৃঢ় করে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয় । এ জন্য তিনি ত্রিমুখী নীতি গ্রহণ করেছিলেন । যথা— ( ১ ) নতুন দুর্গ নির্মাণ করা , ( ২ ) স্থানীয় রাজাদের ভীতি প্রদর্শন করে পোর্তুগিজদের বশীভূত করা এবং ( ৩ ) স্থানীয় নারীদের সাথে পোর্তুগিজদের বিবাহে উৎসাহিত করে সমর্থক বৃদ্ধি করা । প্রশাসক হিসেবে তিনি ছিলেন বিচক্ষণ ।

পোর্তুগিজদের বিফলতার কারণ

অল্পকালের মধ্যেই গোয়া , দমন , দিউ ছাড়া সমস্ত অধিকৃত অঞ্চলই পোর্তুগিজদের হস্তচ্যুত হয়েছিল । ভারতে পোর্তুগিজদের পতনের বা বিফলতার অনেকগুলি কারণ উল্লেখ করা যায় ।

প্রথমত , বিজয়নগরের হিন্দু রাজবংশের সাথে মিত্রতার সূত্রে পোর্তুগিজরা ভারতে নিজেদের ভিত গড়ে তুলেছিল । কিন্তু ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি বিজয়নগর সাম্রাজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে পোর্তুগিজরা ভারতে তাদের অবলম্বন হারিয়ে ফেলে ।

দ্বিতীয়ত , এদেশে পোর্তুগিজদের শাসন ব্যবস্থা ছিল যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ । কর্মচারীদের মধ্যে আনুগত্যের অভাব ছিল । আলবুকার্ক -এর পরবর্তী রাজ – প্রতিনিধিগণ ছিলেন দুর্নীতিগ্রস্ত ও শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে অনভিজ্ঞ । পরন্তু কর্মচারীরা ব্যবসা বাণিজ্যে অংশগ্রহণের ফলে প্রশাসনে দুর্নীতি প্রবেশ করেছিল ।

তৃতীয়ত , সামাজিক ও ধর্মীয় কারণে পোর্তুগিজরা এদেশে দ্রুত জনপ্রিয়তা হারিয়েছিল । মিশ্র বিবাহ নীতি চালু করার ফলে যে মিশ্রশ্রেণির উদ্ভব ঘটেছিল , তারা শুধু পোর্তুগিজ বা শুদ্ধ ভারতীয় — কারও কাছেই আকাঙ্ক্ষিত ছিল না । তা ছাড়া এই শ্রেণির সামরিক দক্ষতাও বিশেষ ছিল না । ভারতবাসীর ধর্মীয় অসন্তোষ ছিল আরও তীব্র । হিন্দু নারীদের জোরপূর্বক লুণ্ঠন ও বিবাহ , ভারতীয়দের বন্দি করে বিক্রয় , জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিতকরণ , মঠ ও মন্দির ধ্বংস প্রভৃতি পোর্তুগিজদের কাজ ভারতবাসীর ঘৃণা ও বিদ্বেষ বৃদ্ধি করেছিল ।

চতুর্থত , ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে পোর্তুগাল স্পেন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় । অতঃপর ভারতে পোর্তুগিজদের উপনিবেশ রক্ষার ব্যাপারে স্পেনের কোনো আগ্রহ ছিল না । ফলে এদেশে পোর্তুগিজরা সরকারি সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয় । পরিশেষে বলা যায় যে , ওলন্দাজ ও ইংরেজ বণিকদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো নৌ-বল পোর্তুগিজদের ছিল না । দেশীয় শক্তিগুলিও পোর্তুগিজদের বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে । এই সমস্ত কারণে বলা যায় যে , “ though the earliest intruder in the east , Portugal could not establish any permanent dominition in India . ”  

ওলন্দাজ বণিকদের আগমন

ভারতে পোর্তুগিজদের বাণিজ্য ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠায় প্রথম আঘাত হেনেছিল ওলন্দাজগণ । নেদারল্যান্ডের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলি ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে মিলিত হয়ে ‘ ইউনাইটেড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ‘ নামে একটি বৃহৎ বাণিজ্য সংঘ গড়ে তোলে । বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে অগ্রসর হলে পোর্তুগিজদের সাথে যুদ্ধ বাধে । ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে তারা পোর্তুগিজদের কাছ থেকে অ্যামবায়ানা কেড়ে নেয় । পরের বছর মালাক্কার কাছে পোর্তুগিজদের পরাজিত করে ওলন্দাজরা জাকার্তা দখল করে এবং ঘাঁটি নির্মাণ করে ।  

পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে ইংরেজ বণিকরা সরে গেলে ওলন্দাজরা ভারতের দিকে আকৃষ্ট হয় । সিংহলের রাজার অনুমতি সাপেক্ষে ওলন্দাজরা সিংহল দ্বীপে নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করে । ভারতের পশ্চিম উপকূলে সুরাট , কোচিন , কালিকট ; পূর্ব উপকূলে মসুলিপত্তনম , পুলিকট , নেগাপত্তনম , উড়িষ্যার বালেশ্বর এবং বাংলার চুঁচুড়া , কাশিমবাজার , বিহারের পাটনা প্রভৃতি স্থানে পোর্তুগিজদের পরাজিত ও বিতাড়িত করে ওলন্দাজরা বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল ।

ইতিমধ্যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে তাদের শক্তি যথেষ্ট বৃদ্ধি করেছিল । তাই ওলন্দাজদের ইংরেজদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হয় । ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দে ‘বিদারার যুদ্ধে ’ ইংরেজদের হাতে চরমভাবে পরাজিত হলে ভারতে ওলন্দাজ বণিকদের বাণিজ্য সম্ভাবনা নিশ্চিতভাবে শেষ হয়ে যায় ।

ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ বণিকদের আগমন

রানি এলিজাবেথের রাজত্বকালে ইংরেজগণ দুর্ধর্ষ ‘স্প্যানিশ আর্মাডা’ ধ্বংস করলে ( ১৫৮৮ খ্রিঃ ) ইংরেজ বণিকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় । সামুদ্রিক প্রাধান্য লাভের জন্য ইংরেজ জাতির মধ্যে নতুন উৎসাহের সঞ্চার ঘটে । ফ্রান্সিস ড্রেক ও র‌্যাফল ফীচ ভারত প্রদক্ষিণ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনান্তে প্রাচ্যের বিপুল ঐশ্বর্য এবং ব্যবসা বাণিজ্যের সম্ভাবনার কথা প্রচার করলে প্রাচ্যে বাণিজ্য বিস্তারের জন্য ইংরেজ বণিকরা আগ্রহী হয়ে ওঠে । কয়েকজন বণিকের আবেদনক্রমে রানি এলিজাবেথ এক রাজকীয় সনদ দ্বারা ‘ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ‘ নামে ( ১৬০০ খ্রিঃ ) এক বণিক সংঘকে প্রাচ্য দেশে পনেরো বছরের জন্য একচেটিয়া বাণিজ্য অধিকার প্রদান করেন । ১৬০৮ খ্রিস্টেব্দে এই কোম্পানির উদ্যোগে ভারতে বাণিজ্য বিস্তারের চেষ্টা শুরু হয় ।

ক্যাপ্টেন হকিন্স :

ক্যাপ্টেন হকিন্স ইংল্যান্ডরাজ প্রথম জেমস -এর সুপারিশপত্র নিয়ে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে উপস্থিত হন ( ১৬০৮ খ্রিঃ ) । হকিন্স জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের অনুমতিও লাভ করেন । তবে পোর্তুগিজ বণিকদের বিরোধিতার ফলে ইংরেজগণ বিশেষ সুবিধা করতে ব্যর্থ হয় । ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে ক্যাপ্টেন বেস্ট পোর্তুগিজদের পরাজিত করেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের ফরমান দ্বারা ( ১৬১৩ খ্রিঃ ) সুরাটে ইংরেজ কুঠি স্থাপনের অনুমতি লাভ করেন ।

টমাস রো :

১৬১৫ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডরাজ প্রথম জেমস -এর দূত রূপে স্যার টমাস রো মুঘল রাজসভায় আসেন । তখন এদেশে ইংরেজ বণিকদের দুর্দিন চলছে । টমাস রো’র উদ্দেশ্য ছিল মুঘল সম্রাটের সাথে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করা । ব্যক্তিগতভাবে রো ছিলেন পণ্ডিত , ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এবং সদালাপী । তাই মুঘল সম্রাটকে মুগ্ধ করে তিনি শর্তসাপেক্ষে ইংরেজদের জন্য ব্যবসার অনুমতি লাভ করেন । চার বছরের মধ্যেই সুরাট , আহমেদাবাদ , আগ্রা , ব্রোচ প্রভৃতি স্থানে ইংরেজদের বাণিজ্যকুঠি স্থাপিত হয় । অবশ্য তখনও পোর্তুগিজ বিরোধিতা ইংরেজদের ব্যতিব্যক্ত করে রেখেছিল ।  

১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডরাজ দ্বিতীয় চার্লসের সাথে পোর্তুগাল রাজকন্যা ক্যাথরিন বার গাঞ্জা’র বিবাহ হলে উভয় দেশের মধ্যে শত্রুতার অবসান ঘটে । দ্বিতীয় চার্লস যৌতুক হিসেবে প্রাপ্ত বোম্বাই শহরটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে প্রদান করলে এটিই ইংরেজদের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয় । এরপর একে একে মসুলিপত্তনম , মাদ্রাজ , বালেশ্বর , পাটনা , কাশিমবাজার প্রভৃতি স্থানে ইংরেজদের বাণিজ্যকুঠি নির্মিত হয় ।

জব চার্নক :

ধীরে ধীরে ইংরেজগণ ভারত সংক্রান্ত নীতির পরিবর্তন ঘটায় এবং অস্ত্রবলে ক্ষমতা বিস্তারের সিদ্ধান্ত নেয় । ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে তারা মুঘলদের পরাজিত করে হুগলি দখল করে । জব চার্নক উলুবেড়িয়াতে ( হাওড়া জেলা ) কুঠি নির্মাণের অনুমতি লাভ করেন । ঔরঙ্গজেব ও জব চার্নকের মধ্যে স্বাক্ষরিত এক চুক্তি দ্বারা কোম্পানি কলকাতা , সুতানুটি ও গোবিন্দপুর ক্রয়ের অধিকার লাভ করে ( ১৬৯০ খ্রিঃ ) । ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডরাজ তৃতীয় উইলিয়াম এর নামানুসারে নির্মিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ ।  

এই সময় অপর একটি ব্রিটিশ কোম্পানি এদেশে বাণিজ্য অধিকার লাভ করলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি স্বদেশীয়দের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হয় । শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার চাপে দুটি কোম্পানি সংযুক্ত করে “ The United Company of Merchants of England Trading to the East Indies ” নামে পরিচিত হয় । এরপর ইংরেজ কোম্পানি অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে চলে এবং কালক্রমে সমগ্র ভারতের শাসন ক্ষমতাও দখল করে ।

ফরাসি বণিকদের আগমন

ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে ফরাসিরাই সবশেষে ভারতে আসে । ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে ‘ ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ‘ গঠিত হবার পর ফরাসিরা প্রাচ্যে বাণিজ্য বিস্তারে উদ্যোগী হয় । অতঃপর তারা সুরাট ( ১৬৬৭ ) , মসুলিপত্তনম্ ( ১৬৬৯ ) এবং মাদ্রাজের নিকট সেন্ট টোম ( ১৬৭২ ) -এ বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ করে । কিন্তু ওলন্দাজদের বিরোধিতার ফলে সেন্ট টোম্ তাদের হস্তচ্যুত হয় । কিন্তু ফ্রাঁসোয়া মার্টিন -এর সুদক্ষ নেতৃত্বে ফরাসিরা পণ্ডিচেরী ও চন্দননগরে বাণিজ্য বিস্তারে সক্ষম হয় । তার মৃত্যুর পর কারিগকল ও মাহে ফরাসিদের হস্তগত হয় । কিন্তু অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা , গঠনতান্ত্রিক ত্রুটি ও ইংরেজ বণিকদের তীব্র বিরোধিতার ফলে ভারতে ফরাসিরা ব্যর্থ হতে থাকে ।

পোর্তুগিজ , ওলন্দাজ , ইংরেজ ও ফরাসি বণিকদল ছাড়াও দিনেমার , ফ্ল্যান্ডার্স , সুইডিশ প্রভৃতি বণিক দল ভারতে বাণিজ্য বিস্তারে উদ্যোগী হয়েছিল । কয়েকটি অঞ্চলে তারা বাণিজ্য কুঠি নির্মাণে সক্ষম হলেও তার স্থায়িত্ব ছিল খুবই ক্ষীণ এবং গুরুত্ব ছিল অনুল্লেখ্য ।

error: Content is protected !!