শিখ ধর্মের অভ্যুত্থান ও মুঘলদের সাথে বিরোধ

শিখ ধর্মের অভ্যুত্থান ও মুঘলদের সাথে বিরোধ

চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যে ধর্মসংস্কার আন্দোলন শুরু হয় , তারই সূত্র ধরে উত্তর – পশ্চিম ভারতে গুরু নানক তাঁর বাণী প্রচার শুরু করেন । গুরু নানকের শিক্ষা ও আদর্শকে ভিত্তি করেই শিখধর্মের উদ্ভব হয় এবং কালক্রমে এই শিখ সম্প্রদায় একটি শক্তিশালী , শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীতে পরিণত হয় । উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পথ ধরে তুর্কি , আফগান , মোঙ্গল প্রভৃতি মুসলমান জাতি ভারতে প্রবেশ করেছে । ফলে ওই অঞ্চলে ইসলাম সংস্কৃতি দ্রুত বিস্তার লাভ করে । পরন্তু হিন্দুধর্মের বাহ্যিক অনুষ্ঠানের কঠোরতা ও জাতিভেদ প্রথা ওই অঞ্চলের পরিশ্রমী জাঠদের হিন্দুধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল । এমতাবস্থায় গুরু নানকের উদার ধর্মমত খুব সহজেই পাঞ্জাববাসীদের আকৃষ্ট করে ।

শিখ গুরুগণ

অবশ্য নানক স্বতন্ত্র কোনো ধর্মমত প্রচারের উদ্দেশ্যেই তাঁর বাণী প্রচার করেছিলেন কিনা সে বিষয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে । কারও মতে , তিনি ছিলেন হিন্দুধর্মের সংস্কারক মাত্র । কারণ হিন্দুধর্মের আদর্শ বা ঐতিহ্যকে তিনি অস্বীকার করেননি । বেদ , পুরাণের দার্শনিক তত্ত্বের প্রতিও তিনি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন । তবে হিন্দুধর্মের বাহ্যিক আড়ম্বর , জাতিভেদ , অস্পৃশ্যতা প্রভৃতি কয়েকটি কুপ্রথার তিনি বিরোধিতা করেছিলেন । পাইন – এর মতে , “ গুরু নানক হিন্দুধর্মের অবসানের পরিবর্তে তার প্রাচীন ঐতিহ্য ও শুচিতা পুনঃপ্রবর্তনের শিক্ষা দিয়েছিলেন । অপরপক্ষের মতে , নানক ছিলেন বিপ্লবী । কুসংস্কার জর্জরিত হিন্দু সমাজকে ভেঙে এক প্রগতিশীল ও কুসংস্কার মুক্ত সমাজগঠনে তিনি প্রয়াসী হয়েছিলেন । যাই হোক , গুরু নানক হয়তো পূর্ব পরিকল্পনা মতো কোনো নতুন ধর্মমত গঠনে প্রয়াসী হননি । কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তাঁর অনুগামীরা এক নতুন ধর্ম বিশ্বাসের অধীন হয় , যা ‘ শিখ ধর্ম ‘ নামে খ্যাত ।

গুরু অঙ্গদ :

গুরু নানকের মৃত্যুর পরে ( ১৫৩৮ খ্রিঃ ) যথাক্রমে গুরু অঙ্গদ ( ১৫৩৮ – ১৫৫২ খ্রিঃ ) , গুরু অমর দাস ( ১৫৫২ – ১৫৭৪ খ্রিঃ ) ও গুরু রামদাস ( ১৫৭৫ – ১৫৮১ খ্রিঃ ) নানকের উত্তরাধিকারী মনোনীত হয় । তাঁদের সময়ে শিখগণ একটি বিশিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ে পরিণত হয় । গুরু অঙ্গদের দুটি উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হল গুরু নানকের বাণী ও উপদেশগুলিকে লিপিবদ্ধ করা এবং স্বতন্ত্র গুরুমুখী ভাষার প্রবর্তন করা । এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন স্থানে একাধিক ‘ গুরু কালঙ্গর ‘ ( গুরুদ্বার ) নির্মাণ করেন ।

গুরু অমর দাস :

গুরু অমর দাস -এর নেতৃত্বে শিখ সংগঠন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে । তিনি শিখ-পন্থ ( সম্প্রদায় ) -কে ২২ টি মঞ্জিতে ( Manjis ) বিভক্ত করে প্রতিটি মঞ্জির দায়িত্ব একজন করে ধর্মপ্রাণ শিখের উপর ন্যস্ত করেন । তিনি শিখদের সুরাপান নিষিদ্ধ করেন ।

গুরু রামদাস :

গুরু রামদাস সম্রাট আকবরের কাছ থেকে প্রাপ্ত জমির উপর ‘ অমৃতসর ’ বা অমৃত সরোবর খনন করেন । এই সরোবরের তীরে শিখদের প্রধান মন্দির গড়ে ওঠে । এই শহর ‘ অমৃতসর ‘ নামে পরিচিত হয় ।

গুরু অর্জুন :

পঞ্চম গুরু অর্জুন ( ১৫৮১-১৬০৬ খ্রিঃ ) অমৃত সরোবরের মাঝে হরমন্দির তৈরি করেন এবং গুরু নানকের বাণী সংকলিত করে ‘ গ্রন্থসাহেব ’ রচনা করেন । তিনি অনুগামীদের স্বেচ্ছাদানের নির্দেশ দেন । যেসব শিখ এই অর্থ আদায় করতেন , তাঁদের উপাধি ছিল ‘ মসন্দ ’ । এই অর্থাগমের ফলে শিখ সংগঠনের আর্থিক ভিত সুদৃঢ় হয় । সেই সময় থেকেই শিখগণ রাজনীতির আবর্তে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয় । গুরু অর্জুন জাহাঙ্গীরের বিদ্রোহী পুত্র খসরুকে আশ্রয় দান করেন । এই অপরাধে অর্জুনকে বন্দি করে আনা হয় ও অর্থদণ্ড করা হয় । কিন্তু তিনি অর্থ দিতে অস্বীকৃত হলে জাহাঙ্গীরের নির্দেশে হত্যা করা হয় । এই ঘটনা শিখপন্থকে মর্মাহত ও বিক্ষুব্ধ করে তোলে এবং তারা মুঘলের শত্রুতে পরিণত হয় ।

গুরু হরগোবিন্দ :

ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ ( ১৬০৬ – ‘৪৫ খ্রিঃ ) শিখদের সামরিক সংগঠনে পরিণত করতে উদ্যোগ নেন । তিনি নিজে ‘সাচ্চা বাদশা‘ উপাধি গ্রহণ করেন এবং শিষ্যদের কাছ থেকে অর্থের পরিবর্তে সামর্থ্য অনুযায়ী অশ্ব ও অস্ত্র সংগ্রহ করতে শুরু করেন । জাহাঙ্গীর হরগোবিন্দর সামরিক কার্যকলাপে শঙ্কিত হয়ে তাকে বন্দি করে গোয়ালিয়র দুর্গে আবদ্ধ করে রাখেন । কয়েক বছর পরে মুক্তি পেয়ে তিনি গোপনে শিখ সংগঠনকে সংহত করতে থাকেন । শাহজাহানের রাজত্বকালে পুনরায় শিখ-মুঘল সংঘর্ষ শুরু হয় । কর্তারপুর ও অমৃতসর এর যুদ্ধে শিখ বাহিনী মুঘলের হাতে পরাজিত হয় । গুরু হরগোবিন্দ কাংড়ার পার্বত্য অঞ্চলে আত্মগোপন করে নিজেকে রক্ষা করেন ।

পরবর্তী গুরুদ্বয় যথাক্রমে হর রাই ( ১৬৪৫-১৬৬১ খ্রিঃ ) ও হরকিষেন ( ১৬৬১ – ১৬৬৪ খ্রিঃ ) -এর সময়েও শিখ-মুঘল শত্রুতা অব্যহত থাকে ।

গুরু তেগ বাহাদুর :

 শিখদের নবম গুরু ছিলেন তেগ বাহাদুর ( ১৬৬৪-১৬৭৫ খ্রীঃ ) । তিনি শিখ-পন্থকে প্রচণ্ড শক্তিশালী করে গড়ে তোলেন এবং প্রকাশ্যে মুঘল বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের হিন্দু বিদ্বেষী নীতির তীব্র সমালোচনা করেন । জিজিয়া করের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন গড়ে তোলার ডাক দেন । ক্ষুব্ধ ঔরঙ্গজেব তেগ বাহাদুরকে বন্দি করেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে আদেশ দেন । কিন্তু গুরু তেগ বাহাদুর মৃত্যুবরণ করেও নিজধর্মের পবিত্রতা রক্ষা করেন । নবম গুরুর এই নির্মম হত্যা শিখদের মনে প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে ।

গুরু গোবিন্দ সিংহ :

তেগ বাহাদুরের মৃত্যুর পর শিখ গুরু ( দশম ) হন তাঁর পঞ্চদশবর্ষীয় পুত্র গোবিন্দ সিংহ ( ১৬৭৫-১৭০৮ খ্রিঃ ) । পিতার নৃশংস হত্যার জন্য মুঘলের উপর তাঁর প্রচণ্ড ক্ষোভ ছিল । তিনি অনুভব করেন যে , সশস্ত্র প্রতিরোধ ছাড়া শিখ জাতির অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব হবে না । তিনি এজন্য শিখপন্থকে নতুনভাবে সংগঠিত করেন । তিনি গুরু-পদের অবসান ঘোষণা করেন । তিনি জানান , ‘ খালসা’ই হবে গুরু এবং গুরু হল ‘ খালসা ’ । ‘ খালসা ’ কথার অর্থ পবিত্র । শিখজাতির এক সম্মেলন ডেকে তিনি ৫ জন শিখকে মনোনীত করেন । এঁদের নাম হয় ‘পঞ্চ পিয়ারে’ । শিখধর্মে এঁরাই দীক্ষা দেবেন । দীক্ষা গ্রহণের পর প্রতিটি শিখই হবে ‘ খালসা’র সদস্য ।

মুঘলদের প্রতিহত করার জন্য তিনি আনন্দগড় , কেশগড় প্রভৃতি কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করেন এবং আনন্দপুর নামক স্থানকে সুরক্ষিত করে সেখানেই বসবাস শুরু করেন । আনন্দপুর শিখজাতির প্রধান কর্মকেন্দ্রে পরিণত হয় ।

আনন্দপুরের প্রথম যুদ্ধে ( ১৭০১ খ্রিঃ ) শিখ বাহিনী জয়লাভ করে । কিন্তু দ্বিতীয় যুদ্ধে ( ১৭০৩ খ্রিঃ ) বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেও শিখবাহিনী মুঘলের হাতে পরাজিত হয় । গোবিন্দ সিংহের দুই পুত্রকে হত্যা করা হয় । গুরু চক্-মোতে তাঁর বাহিনীর সাথে মিলিত হন । মুঘল বাহিনী চক্‌মো আক্রমণ করে শিখ বাহিনীকে আবার পরাজিত করে । এখানে গুরুর অপর দুই পুত্র নিহত হয় । গোবিন্দ সিংহ পাতিয়ালায় গিয়ে নতুন করে খালসা বাহিনী গঠন করেন । এখান থেকেই তিনি ঔরঙ্গজেবের উদ্দেশ্যে রচিত তার বিখ্যাত খোলা চিঠি ‘ জাফরনামা ’ প্রকাশ করেন । পরে ঔরঙ্গজেব গুরু গোবিন্দ সিংহ বাহাদুর শাহের সাথে সাক্ষাৎ করেন । উভয়ের মধ্যে মিত্রতা স্থাপিত হয় । ১৭০৮ খ্রিস্টাব্দে এক পাঠান আততায়ীর ছুরি কাঘাতে গোবিন্দ সিংহ নিহত হন ।

দশম গুরু গোবিন্দ সিংহের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ‘ গুরু ‘ -পদ বিলুপ্ত হলেও ‘ খালসা ’ ও শিখ-পন্থ শিখজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ চালাতে থাকে ।

error: Content is protected !!