জাহাঙ্গীরের রাজত্বকাল

জাহাঙ্গীরের রাজত্বকাল

আকবর মৃত্যুর পূর্বেই তাঁর পুত্র সেলিমকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান । তবে আকবর যখন মৃত্যুশয্যায় , সেই সময় মানসিংহ , আজিজ কোকা প্রমুখ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সেলিমের পরিবর্তে তাঁর পুত্র খসরুকে আকবরের উত্তরাধিকারী মনোনীত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন । প্রসঙ্গত স্মরণীয় , খসরু ছিলেন মানসিংহের ভাগিনেয় এবং আজিজ কোকার জামাতা । খসরু ছিলেন সুদর্শন এবং উদার । কিন্তু তাঁদের এই উদ্যোগ সফল হয়নি । আকবর সেলিমকেই সিংহাসন দানের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন । ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হলে সেলিম ‘নুরুদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গীর’ উপাধি নিয়ে দিল্লির সিংহাসনে বসেন ।

খসরুর বিদ্রোহ দমন

সিংহাসনে বসে তিনি খসরু বা বিরোধী আমিরদের শাস্তিদানের পরিবর্তে ক্ষমা প্রদর্শন করেন , তবে খসরুকে আগ্রা দুর্গে নজরবন্দি করে রাখেন । কিন্তু লাহোরের কাছে মুঘল বাহিনীর হাতে খসরু বন্দি হন । জাহাঙ্গীর তাঁকে দৃষ্টিহীন করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন । এই বিদ্রোহে শিখগুরু অর্জুন খসরুকে সাহায্য করেছিলেন । তাই জাহাঙ্গীর অর্জুনকেও বন্দি ও হত্যা করেন । কোনো ধর্মীয় বিদ্বেষ নয় , — কেবল রাজনৈতিক কারণেই তিনি অর্জুনকে হত্যা করেছিলেন বলে পণ্ডিতদের ধারণা ।

জাহাঙ্গীরের শাসন সংস্কার

খসরুর বিদ্রোহ দমনের পর জাহাঙ্গীর রাজ্য শাসনে মনোনিবেশ করেন । বিচারপ্রার্থীদের সুবিধার জন্য তিনি বিরাট শিকল সমন্বিত একটি ঘণ্টার ব্যবস্থা করেন । তিনি ১২ টি আইন বা ‘ দস্তুর উল আলম ‘ জারি করেন । এই আইন দ্বারা কয়েকটি অতিরিক্ত শুল্ক হ্রাস করা হয় । বছরের কয়েকটি দিন এবং বৃহস্পতিবার পশুবলি নিষিদ্ধ করা হয় । কঠোর শাস্তিদান রহিত করা হয় প্রভৃতি ।

নুরজাহানের সাথে বিবাহ

১৬১১ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীর মেহেরউন্নিসা নামে এক অসামান্যা রূপসি মহিলাকে বিবাহ করেন । এই বিবাহ প্রসঙ্গে একাধিক কাহিনি প্রচলিত আছে । মেহেরউন্নিসা ভাগ্যান্বেষী ইরানি মির্জা গিয়াসবেগের কন্যা । গিয়াসবেগ আকবরের দরবারে নিযুক্ত হন । তিনি আলিকুলী বেগ নামক জনৈক ব্যক্তির সাথে মেহেরের বিবাহ দেন । আলিকুলী আকবরের আমলে বাংলাদেশে জায়গির প্রাপ্ত হন । বীরত্ব সহকারে একটি বাঘ শিকার করার জন্য তিনি ‘ শের আফগান ’ উপাধি পান । অনেকের মতে , সেলিম মেহেরউন্নিসার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিবাহ করতে চান । কিন্তু আকবর এর বিরোধিতা করেন । তাই সম্রাট হবার পরে জাহাঙ্গীর শের আফগানকে হত্যা করেন এবং মেহেরকে বিবাহ করেন ।

অন্যান্যদের মতে , শের আফগানকে হত্যার পূর্বে জাহাঙ্গীর মেহেরউন্নিসাকে দেখেননি । যদি দেখতেন তাহলে সিংহাসনে বসার পরে ৬ বছর অপেক্ষা করবেন কেন ? যাই হোক , বিবাহের পরে জাহাঙ্গীর মেহেরের নাম দেন ‘ নূরজাহান ‘ ( জগতের আলো ) । কালক্রমে প্রভাবশালী আত্মীয় অভিজাতদের সাহায্যে এবং নিজের দক্ষতায় নূরজাহান যে মুঘল রাজনীতিতে প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রণকে পরিণত হয়েছিলেন , তা পরবর্তী আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ।

জাহাঙ্গীরের রাজ্য জয়

আকবরের মতো জাহাঙ্গীরও সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি গ্রহণ করেন । রাজত্বের প্রথম বছরেই তিনি মেবারের বিরুদ্ধে একটি অভিযান পাঠান । কিন্তু তা ব্যর্থ হয় । ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় অভিযান পাঠিয়ে মেবারের রানা অমর সিংহকে পরাজিত করলেও , মেবার দিল্লির কর্তৃত্ব অস্বীকার করে চলে । পাঁচ বছর পরে যুবরাজ খুররম এর নেতৃত্বে প্রেরিত তৃতীয় অভিযান সাফল্য লাভ করে । তবে জাহাঙ্গীর পরাজিত অমর সিংহের প্রতি উদার ব্যবহার করেন এবং উভয়ের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হয় । বাংলায় আফগান নেতা উসমান খাঁ এবং প্রতাপাদিত্য , মুসা খাঁ প্রমুখ ভুঁইয়াগণ তখনও মুঘল অধীনতা অস্বীকার করে চলছিলেন । জাহাঙ্গীর ইসলাম খাঁ’কে বাংলার শাসক নিযুক্ত করে বিদ্রোহীদের দমনের নির্দেশ দেন । ইসলাম খাঁ আফগান বিদ্রোহী ও ভুঁইয়াদের দমন করে সেখানে মুঘল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন । আকবরের আমলে দাক্ষিণাত্যের খান্দেশ ও আহম্মদনগরের একাংশ মুঘল অধিকারভুক্ত হয়েছিল ।

জাহাঙ্গীর দাক্ষিণাত্যে মুঘল অধিকার বিস্তারে বিশেষভাবে সচেষ্ট হন । সেই সময়ে মালিক অম্বর নামে জনৈক হাবশি ক্রীতদাস আহম্মদনগরের সুলতান মূর্তজা আলির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঐ রাজ্যে এক দক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলেছিলেন । মালিক অম্বর রাজস্ব সংস্কার করে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে সুদৃঢ় করেন । মারাঠাদের সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত করে এবং তাদের গেরিলা যুদ্ধপদ্ধতিতে দক্ষ করে সেনাবাহিনীকেও বিশেষ শক্তিশালী করে তোলেন । ঈশ্বরীপ্রসাদের মতে , মালিক অম্বরই প্রথম মারাঠাদের গেরিলা যুদ্ধ পদ্ধতি শিক্ষা দেন ।  

১৬১১ খ্রিস্টাব্দে যুবরাজ পারভেজের নেতৃত্বে মুঘল বাহিনী আহম্মদ নগর আক্রমণ করে । মালিক অম্বর বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার সাথে সংঘবদ্ধ হয়ে এই আক্রমণ প্রতিহত করেন । পাঁচ বছর পরে ( ১৬১৬ খ্রিঃ ) পারভেজের পরিবর্তে যুবরাজ খুররম্ -এর নেতৃত্বে পুনরায় মুঘল বাহিনী আহম্মদনগর অভিযান করে । এবারে মালিক অম্বর পরাজিত হন । জাহাঙ্গীর দাক্ষিণাত্যে সমঝোতার নীতি অবলম্বন করেন । মালিক অম্বরের সাথে মুঘলের এক সন্ধি স্বাক্ষরিত হয় । মুঘলরা কয়েকটি দুর্গ লাভ করে । তবে কোনো নতুন অংশে মুঘল অধিকার বিস্তৃত হয় না । এই জয়ের পুরস্কার স্বরূপ জাহাঙ্গীর যুবরাজ খুররমকে শাজাহান ( জগতের অধিপতি ) উপাধিতে ভূষিত করেন ।

কিছুদিনের মধ্যেই মালিক অম্বর সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে মুঘল বাহিনীকে আক্রমণ করেন ( ১৬১৭ খ্রিঃ ) । ফলে জাহাঙ্গীর শাহজানকে পুনরায় দাক্ষিণাত্যে পাঠান । মালিক অম্বর পরাজিত হয়ে সন্ধি স্থাপনে বাধ্য হন এবং মুঘলদের কর প্রদানে স্বীকৃত হন ( ১৬২১ খ্রিঃ ) । অতঃপর ঘটনাচক্রে শাজাহান জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলির মুঘল বশ্যতা অস্বীকার করতে থাকে । তবে শাহজাহানের বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত থাকায় জাহাঙ্গীর দাক্ষিণাত্যের বিরুদ্ধে আর কোনো অভিযান পাঠাননি । এ ছাড়া জাহাঙ্গীর পাঞ্জাবের উত্তর -পূর্ব সীমায় অবস্থিত কাংড়া দুর্গ জয় করেন । পরে তিনি উড়িষ্যা , বিহার , আসাম ও কাশ্মীরের কিছু কিছু অংশে মুঘল কর্তৃত্ব বিস্তারে সক্ষম হন ।

নূরজাহানের প্রভাব

জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল নূরজাহানের রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিপত্তি । নুরজাহান ছিলেন অসামান্যা রূপসি ও বুদ্ধিমতী । ফারসি ও আরবি ভাষায় তাঁর গভীর ব্যুৎপত্তি ছিল । যে কোনো রাজনৈতিক সমস্যা তিনি খুব সহজেই সমাধান করতে পারতেন । মুঘল দরবারে উচ্চপদে আসীন পিতা মির্জা গিয়াস বেগ , ভ্রাতা আসফ খাঁ এবং জাহাঙ্গীরের অন্যতম সন্তান যুবরাজ খুররমের ( পরবর্তীকালে শাহজাহান ) সাথে মিলিত হয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেন । এই চারজনের ‘ নূরজাহান চক্র ‘ পরিকল্পিত ভাবে জাহাঙ্গীরকে আমোদ-প্রমোদের পিচ্ছিল পথে ঠেলে দেয় । এ কাজে নেতৃত্ব দেন নূরজাহান । ভিন্সেন্ট স্মিথ নূরজাহানকে ‘ সিংহাসনের পশ্চাতে শক্তি ‘ বলে বর্ণনা করেছেন । জাহাঙ্গীর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে ‘ সীমাহীন মদ্যপে ’ পরিণত হন । একসময় তিনি নিজেই মন্তব্য করেন যে , ” I have sold my kingdom to my beloved queen for a cup of wine and a dish of soup” . এইভাবে সম্রাট নূরজাহানের হাতের পুতুলে পরিণত হন । ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে অসুস্থ অবস্থায় জাহাঙ্গীর মারা যান ।

error: Content is protected !!