বৈরাম খাঁ কে ছিলেন

বৈরাম খাঁ কে ছিলেন

হুমায়ুনের আকস্মিক মৃত্যুর পর নাবালক সম্রাট আকবরের অভিভাবক নিযুক্ত হয়েছিলেন বৈরাম খাঁ । মুঘল সাম্রাজ্য রক্ষায় তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য । বৈরাম খাঁ ছিলেন পারস্যের অধিবাসী এবং তিনি ছিলেন শিয়া ধর্মাবলম্বী । হুমায়ুনের রাজ্যচ্যুত অবস্থায় তিনি হুমায়ুনকে অনেক সাহায্য করেন । বৈরামের চেষ্টায় ও সহযোগিতায় হুমায়ুন তাঁর হৃত সাম্রাজ্য পুনর্দখল করতে সক্ষম হন । হুমায়ুনের মৃত্যুর পর নাবালক আকবরকে সম্রাট করা এবং সেই পদকে স্থায়ীকরণের পেছনেও বৈরামের অবদান অনেক । 

আকবরের সমস্যা

আকবরের সিংহাসন আরোহণের মুহূর্তে একাধিক বিপদ উপস্থিত হয়েছিল । যেমন আফগান সর্দার আদিল শাহ কর্তৃক দিল্লি দখল করে আফগান শাসন পুনঃপ্রবর্তনের চেষ্টা , সুলেমান মির্জা কর্তৃক কাবুল অধিকার , সিকন্দার শূর কর্তৃক পাঞ্জাব দখলের প্রচেষ্টা প্রভৃতি । বৈরাম খাঁ বিশ্বস্ততা , দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতার দ্বারা এইসব বিপদ থেকে মুঘল সিংহাসন তথা আকবরকে রক্ষা করেন । তাঁরই দক্ষতায় মুঘল বাহিনী দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে জয়লাভ করে । 

বৈরামের অভিভাবকত্ব

১৫৫৬ থেকে ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে , অর্থাৎ আকবরের সিংহাসনারোহণের প্রথম চার বছর বৈরাম খাঁ ছিলেন মুঘল প্রশাসনের প্রথম নম্বর ব্যক্তি । কিন্তু তাঁর কিছু কিছু সিদ্ধান্ত ক্রমে তাকে আকবর ও অন্যান্য অভিজাতদের নিকট অপ্রিয় করে তোলে । বৈরাম অধিকাংশ ‘ শিয়া ’ ধর্মাবলম্বীকে উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত করলে সুন্নি মুসলমানেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন । আকবরের ধাত্রীমাতা মহাম অনাঘা ও তাঁর পুত্র আদম খা’র নেতৃত্বে অধিকাংশ অভিজাত বৈরামের শত্রুতে পরিণত হন । এমনকি বৈরাম আকবরকেও অসন্তুষ্ট করে তোলেন । তিনি অকস্মাৎ আকবরের ব্যক্তিগত ভাতা বন্ধের আদেশ দেন । হস্তীবাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব আকবরের হাত থেকে কেড়ে নেন । ক্ষমতার দম্ভে বৈরাম ভুলে যান যে , আকবরই সম্রাট এবং তিনি বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছেন । 

পদচ্যুতি ও মৃত্যু

এই অবস্থায় আকবর এক ফরমান জারি করে বৈরাম খাঁ’কে পদচ্যুত করেন এবং মক্কায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন । কিন্তু বৈরামেরই অপ্রিয় ভাজন জনৈক ব্যক্তিকে বৈরামের মক্কাযাত্রার সঙ্গী নিযুক্ত করা হলে , অপমানিত বৈরাম বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন । অবশ্য শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন । রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আকবর বৈরামের সব অপরাধ মাপ করেন এবং মক্কায় যাবার ব্যবস্থা করে দেন । কিন্তু মক্কা যাওয়ার পথে গুজরাটের নিকট জনৈক আফগান বৈরামকে হত্যা করে । 

সমালোচনা

ভিনসেন্ট স্মিথের মতে , বৈরামের পদচ্যুতি ও তাঁর মৃত্যু আকবরের চরম অকৃতজ্ঞতার নির্লজ্জ প্রদর্শন । তাঁর মতে , স্বার্থন্বেষী আমির-ওমরাহগণ একদিকে নবীন সম্রাটকে বৈরাম বিরোধী করে তুলেছিলেন এবং অন্যদিকে বৈরামকে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে বাধ্য করেছিলেন । অবস্থার প্রকৃত তাৎপর্য বিচারের দায়িত্ব ছিল আকবরের । সে কাজে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন । আবুল ফজলও স্বীকার করেছেন যে , “ বৈরাম ছিলেন একজন প্রকৃতই সজ্জন ব্যক্তি ও মহৎ গুণাবলীর অধিকারী । ” তাই মুঘল সাম্রাজ্যের এত বড়ো একজন বন্ধুর এমন হীনভাবে পদচ্যুতি ও মৃত্যু আকবরের চরিত্রে কালিমা লিপ্ত করেছে , একথা অস্বীকার করা যায় না ।

error: Content is protected !!