মেন্ডেলের একসংকর জননের পরীক্ষা

মেন্ডেলের একসংকর জননের পরীক্ষা

একজোড়া বিপরীতধর্মী লক্ষণযুক্ত ( Contrasting character ) একই প্রজাতির দুটি বিশুদ্ধ জীবের মধ্যে পরনিষেক ঘটানাের পদ্ধতিকে একসংকর জনন বা মনোহাইব্রিড ক্রস বলা হয় ।

একটি বিশুদ্ধ বৈশিষ্ট্য যুক্ত দীর্ঘাকার ( TT ) মটরগাছের সঙ্গে একটি বিশুদ্ধ বৈশিষ্ট্যযুক্ত খর্বাকার ( tt ) মটরগাছের মধ্যে সংকরায়ণ বা ইতর পরাগযােগ ঘটিয়ে মেন্ডেল প্রথম অপত্য বংশে অর্থাৎ F1 জনুতে সকল মটরগাছই দীর্ঘাকার ( সংকর লম্বা Tt ) পেয়েছিলেন । এরপর মেন্ডেল প্রথম অপত্য বংশে উৎপন্ন মটরগাছগুলির মধ্যে স্ব পরাগযােগ ঘটান এবং লক্ষ করেন দ্বিতীয় অপত্য বংশে অর্থাৎ F2 জনুতে উৎপন্ন মটরগাছগুলির মধ্যে তিনভাগ অর্থাৎ 75 % দীর্ঘাকার এবং একভাগ অর্থাৎ 25 % খর্বাকার মটরগাছ উৎপন্ন হয়েছে । অর্থাৎ দ্বিতীয় অপত্য বংশে মটরগাছের একসংকর জননের বাহ্যিক লক্ষণগত অনুপাত বা ফিনােটাইপ গত অনুপাত 3 : 1 ।

মেন্ডেল F2 বংশে উৎপন্ন মটরগাছগুলির মধ্যে পুনরায় স্ব নিষেক ঘটান এবং লক্ষ করেন 3 ভাগ দীর্ঘাকার মটরগাছের মধ্যে 1 ভাগ দীর্ঘাকার মটর গাছ থেকে শুধু দীর্ঘাকার মটরগাছই উৎপন্ন হয়েছে , বাকি ২ ভাগ দীর্ঘাকার মটরগাছ থেকে দীর্ঘাকার এবং খর্বাকার মটরগাছ উৎপন্ন হয়েছে । অর্থাৎ 3 ভাগ দীর্ঘাকার মটরগাছের মধ্যে 1 ভাগ বিশুদ্ধ বৈশিষ্ট্যযুক্ত দীর্ঘাকার মটর গাছ এবং 2 ভাগ সংকর বৈশিষ্ট্যযুক্ত দীর্ঘাকার মটরগাছ । মেন্ডেল লক্ষ করেছিলেন F2 জনুতে উৎপন্ন 1 ভাগ খর্বাকার মটরগাছ থেকে স্ব নিষেকের ফলে উৎপন্ন মটরগাছগুলি প্রত্যেকটিই খর্বাকার অর্থাৎ F2 জনুর 1 ভাগ খর্বাকার মটরগাছ বিশুদ্ধ বৈশিষ্ট্যযুক্ত সুতরাং একসংকর জননে F2 জনুর উৎপন্ন মটর গাছগুলির জিনােটাইপগত অনুপাত 1( TT ) : 2( Tt ) : 1( tt ) । 

আবার মটরগাছের খর্বাকার বৈশিষ্ট্যটি F1 জনুতে প্রকাশ পায়নি কিন্তু , জনুর একভাগ অর্থাৎ 25 % মটরগাছ খর্বাকার বৈশিষ্ট্যযুক্ত হয়েছে । এর থেকে সহজেই বােঝা যায় F1 জনুতে দীর্ঘাকার এবং খর্বাকার উভয় বৈশিষ্ট্যই বর্তমান ছিল কিন্তু দীর্ঘাকার বৈশিষ্ট্যটির উপস্থিতিতে খর্বাকার বৈশিষ্ট্যটি অবদমিত ছিল অর্থাৎ মটরগাছের ক্ষেত্রে দীর্ঘাকার বৈশিষ্ট্যটি প্রকট বৈশিষ্ট্য এবং খর্বাকার বৈশিষ্ট্যটি প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য ।

প্রকট ও প্রচ্ছন্ন গুণ

মেন্ডেল একসংকর জনন পরীক্ষার মাধ্যমে লক্ষ করেন পিতামাতার বিপরীত গুণজোড়া যখন অপত্যে সঞ্চারিত হয় তখন বিপরীত গুণজোড়ার মধ্যে যেটি প্রকটগুণ সেটিই অপত্যে প্রকাশিত হয় অপর গুণটি প্রচ্ছন্ন অবস্থায় থাকে । মটরগাছের ক্ষেত্রে লম্বা এবং বেঁটে গুণ দুটির মধ্যে শুধুমাত্র লম্বা গুণটিই প্রথম অপত্য জনুতে প্রকাশিত হয়েছে অর্থাৎ পিতামাতার বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যর মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যটি অপত্য প্রকাশিত হয় তাকে প্রবল বা প্রকট গুণ এবং যে বৈশিষ্ট্যটি অপত্যে উপস্থিত থেকেও প্রকাশিত হয় না তাকে প্রচ্ছন্ন গুণ বলে । 

ফিনোটাইপ ও জিনোটাইপ

ফিনোটাইপ : জীবের বৈশিষ্ট্যের বাহ্যিক প্রকাশকে ফিনোটাইপ বলে । মেন্ডেলের একসংকর জনন পরীক্ষায় দ্বিতীয় অপত্য বংশে 3 ভাগ লম্বা এবং 1 ভাগ বেঁটে মটরগাছ উৎপন্ন হয়েছে । সুতরাং মেন্ডেলের একসংকর জনন পরীক্ষায় ফিনোটাইপ অনুপাত ছিল 3 : 1 ।

জিনোটাইপ : জীবের ক্রোমােজোমে অবস্থিত জিনের সংযুক্তিকে জিনোটাইপ বলে । মেন্ডেলের একসংকর জনন পরীক্ষায় দ্বিতীয় অপত্য বংশে উৎপন্ন 3 ভাগ লম্বা এবং 1 ভাগ বেঁটে মটরগাছের জিনগত সংযুক্তি পরীক্ষা করলে দেখা যায় লম্বা গাছগুলির মধ্যে 1 ভাগ বিশুদ্ধ লম্বা ( TT ) দুভাগ সংকর লম্বা ( Tt ) ছিল এবং বেঁটে গাছগুলি ছিল বিশুদ্ধ বেঁটে ( tt ) । সুতরাং মেন্ডেলের একসংকর জনন পরীক্ষায় জিনগত সংযুক্তি ছিল 1:2:1 ।

মেন্ডেলের সিদ্ধান্ত 

একসংকর জননের পরীক্ষা থেকে মেন্ডেল নিম্নলিখিত সূত্রটি উপস্থাপন করেন । পৃথকীকরণ সূত্র বা পৃথকীভবন সূত্র ( Law of Segregation ) : একই প্রজাতির একজোড়া বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যযুক্ত দুটি জীবের মধ্যে ক্রসের ফলে একজাতীয় বিপরীত বৈশিষ্ট্যের উপাদান বা ফ্যাক্টর জনিতৃ জনু থেকে অপত্য জনুতে একত্রিত হলে তারা কখনও পরস্পর মিশ্রিত হয় না , পরন্তু জননকোশ বা গ্যামেট গঠনকালে তারা পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যায় ।

error: Content is protected !!