অঙ্গজ জনন কাকে বলে

অঙ্গজ জনন কাকে বলে

যে জনন পদ্ধতিতে দেহের কোনো অঙ্গ বা দেহের অংশ জনিতৃ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অপত্য জীব সৃষ্টি করে , তাকে অঙ্গজ জনন বলা হয় ।  

অঙ্গজ জননের প্রকারভেদ

উদ্ভিদদেহে বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক উপায়ে অঙ্গজ জনন দেখা যায় , যথা-

কোরকোদগম বা মুকুলোদগম দ্বারা :

অনুকুল পরিবেশে ঈস্ট নামে এককোষী ছত্রাকের কোশদেহের কোনাে অংশ স্ফীত হয়ে ওঠে । স্ফীত অংশে সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়াসের খণ্ড প্রবেশের পর ওই অংশটি আরও বৃদ্ধি পেয়ে কোরক বা মুকুল গঠন করে । এই কোরক বা মুকুল মাতৃকোশ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অপত্য ঈস্টে পরিণত হয় । 

দ্বিবিভাজন পদ্ধতির দ্বারা :

ব্যাকটিরিয়া , ঈস্ট এবং কয়েকপ্রকার এককোশি শৈবালে জনিতৃ কোশের নিউক্লিয়াসটি প্রথমে অ্যামাইটোসিস পদ্ধতিতে বিভাজিত হয়ে দুটি অপত্য নিউক্লিয়াস গঠন করে এবং সঙ্গে সঙ্গেই কোশপর্দাসহ সাইটোপ্লাজম মাঝ বরাবর সংকুচিত হয়ে বিচ্ছিন্ন হয় । ফলে দুটি অপত্য কোশের সৃষ্টি হয় এবং অপত্য কোশ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে পরিণত উদ্ভিদে পরিবর্তিত হয় ।

খন্ডীভবন :

অণু সূত্রাকার শৈবাল ( যেমন স্পাইরােগাইরা , অসিলেটোরিয়া ) , অণুসূত্রাকার ছত্রাক ( যেমন — মিউকর ) প্রভৃতির দেহ এক বা একাধিক খণ্ডে বিভক্ত হলে , প্রতিটি অপত্য দেহ খণ্ডাংশ কোশবিভাজনের মাধ্যমে বৃদ্ধি পেয়ে পরিণত জীবের সৃষ্টি করে । মস এবং ফার্নবর্গের উদ্ভিদে এই প্রকার জনন দেখা যায় । 

বুলবিলের দ্বারা :

চুপড়ি আলু , খাম আলু , কন্দ পুষ্প প্রভৃতি উদ্ভিদের পাতার কক্ষে উৎপন্ন কাক্ষিক মুকুল পর্যাপ্ত খাদ্য সঞ্চয়ের ফলে স্ফীত ও গােলাকার হয়ে বুলবিল গঠন করে । পরিণত বুলবিল জনিতৃদেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে খসে পড়ে অনুকূল পরিবেশে অপত্য উদ্ভিদের সৃষ্টি করে । 

অস্থানিক মুকুল দ্বারা :

অস্থানিক মুকুল পত্রাশয়ী , মূলজ এবং কাণ্ডজ হয় । পাথরকুচি , বিগনােনিয়া , হিমসাগর প্রভৃতি উদ্ভিদের পাতার কিনারায় মুকুল নির্গত হয় । এই মুকুলগুলি বৃদ্ধি পেয়ে অপত্য উদ্ভিদের সৃষ্টি করে এবং পাতা নষ্ট হয়ে গেলে অপত্য উদ্ভিদ স্বাধীনভাবে বৃদ্ধি পায় । রাঙাআলু ( কন্দাল মূল ) , পটল , ইপিকাক প্রভূতি উদ্ভিদের মূলে অস্থানিক মুকুল উৎপন্ন হয় । এই অস্থানিক মুকুল বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে অপত্য উদ্ভিদের সৃষ্টি করে । গোলাপ , ডালিয়া প্রভৃতি উদ্ভিদের কান্ড ছাঁটার পর অংশগুলির চারপাশে অস্থানিক মুকুল নির্গত হয় । এই অস্থানিক মুকুল বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে অপত্য উদ্ভিদের সৃষ্টি করে । 

মৃদগত কান্ডের দ্বারা :

পেঁয়াজ , রসুন ইত্যাদি কন্দ বা বালব , আদা , হলুদ ইত্যাদি গ্রন্থিকাণ্ড বা রাইজোম , ওল গুঁড়ি কন্দ বা করম , আলু – স্ফীতকন্দ বা টিউবার প্রভৃতি মৃদগত কাণ্ডের মাধ্যমে অঙ্গজ জনন হয় , আদা , হলুদের ক্ষেত্রে কাণ্ড মধ্যস্থ অগ্ৰমুকুল , পেঁয়াজের ক্ষেত্রে অগ্ৰমুকুল , ওলের ক্ষেত্রে কাক্ষিক মুকুল এবং আলুর ক্ষেত্রে ‘ চোখ ’ এ অবস্থিত কাক্ষিক মুকুল অনুকূল পরিবেশে বৃদ্ধি পেয়ে অপত্য উদ্ভিদের সৃষ্টি করে । 

অর্ধ বায়ব কান্ডের দ্বারা :

ভূনিম্নস্থ বা সাকার ( মুথা ঘাস ) , ধাবক বা রানার ( আমরুল ) , বক্র ধাবক ( মেন্থ ) , হ্রস্ব ধাবক ( কচুরিপানা ) প্রভৃতি অর্ধ – বায়ব কাণ্ডের পর্ব থেকে অস্থানিক মুকুল নির্গত হয়ে মাটিতে প্রবেশ করে এবং পর্বস্থিত কাক্ষিক মুকুল বৃদ্ধি পেয়ে বিটপ অংশ গঠন করে । এরপরে জনিতৃ উদ্ভিদের পর্বমধ্য বিনষ্ট হলে নতুন অপত্য উদ্ভিদ সৃষ্টি হয় । 

বায়বীয় পরিবর্তিত কান্ড :

ফণীমনসার বায়বীয় পরিবর্তিত পর্ণকাণ্ড জনিতৃ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে নতুন অপত্য উদ্ভিদ উৎপন্ন করে ।

অঙ্গজ জননের গুরুত্ব বা সুবিধা

অঙ্গজ জননের সুবিধা বা গুরুত্বগুলি হলㅡ

( i ) অঙ্গজ জননের ফলে উৎপন্ন অপত্য উদ্ভিদ জনিতৃ উদ্ভিদের সমগুণ সম্পন্ন হয় । 

( ii ) অঙ্গজ জননের মাধ্যমে অল্পসময়ে অধিক উদ্ভিদ সৃষ্টি করা সম্ভব । 

( iii ) এই জননের ফলে উৎপন্ন অপত্য গাছে অল্প সময়ের মধ্যে ফলন পাওয়া সম্ভব । 

( iv ) অঙ্গজ জনন পদ্ধতিতে অপত্য উদ্ভিদ বছরের যে কোনাে সময়ে সৃষ্টি করা সম্ভব । 

( v ) কৃত্রিম অঙ্গজ জননের মাধ্যমে উন্নত গুণসম্পন্ন ফুল বা ফল যুক্ত উদ্ভিদ ইচ্ছানুসারে বংশ পরম্পরায় সৃষ্টি করা যায় । 

অঙ্গজ জননের অসুবিধা

অঙ্গজ জননের অসুবিধাগুলি হল 一

( i ) অঙ্গজ জননে একটিমাত্র জনিতৃ জীব থেকে অপত্য জীবের সৃষ্টি হওয়ায় , অপত্য জীবে বিভিন্ন গুণাবলির সমন্বয় ঘটে না , ফলে প্রকরণের কোনাে সম্ভাবনা থাকে না । 

( ii ) অঙ্গজ জননে উৎপন্ন অপত্য জীব বৈচিত্র্যহীনতার কারণে পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে অভিযােজিত করতে পারে না ফলে ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয় ।

error: Content is protected !!