জলাভূমি কাকে বলে

জলাভূমি কাকে বলে

জলাভূমি ’ কথাটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয় । প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক সংঘের [ International Union for Conservation of Nature and Natural Resoures ( IUCN ) ] জলাভূমির যে সংজ্ঞা দিয়েছে তা এইরূপ । “ মার্স , বিল , পিটল্যান্ড অথবা প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম জলাশয় , স্রোতযুক্ত বা স্রোতবিহীন , স্বাদু , ঈষৎ লবণাক্ত জলযুক্ত এবং সেই সমস্ত সামুদ্রিক এলাকা যার গভীরতা ভাটার সময় ছয় মিটার অতিক্রম করে না তাই জলাভূমি । ” ইরানের রামসার শহরে ( Ramsar Convention in Iran ) জলাভূমি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে 1971 খ্রিস্টাব্দে এই সংজ্ঞা গৃহীত হয় । 

জলাভূমির বৈশিষ্ট্য

( i ) জলাভূমির ভূমি পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে নীচু হবে এবং এতে সারা বছর সামান্য হলেও জল থাকবে । 

( ii ) জলাভূমির মৃত্তিকার প্রকৃতি পার্শ্ববর্তী জমির মৃত্তিকার প্রকৃতি থেকে পৃথক ধরনের হবে । 

( iii ) জলাভূমিতে বিশেষ জলজ উদ্ভিদ এবং জীব বাস করে যারা এই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলতে সক্ষম । 

( iv ) জলাভূমিগুলির মধ্যে গভীরতার তারতম্য থাকে , তবে তা গভীর জলাশয়ের মতাে হয় না । 

( v ) জলাভূমির বাস্তুতন্ত্র জলাশয় এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র থেকে পৃথক ধরনের হয় ।

( vi ) জলাভূমির আকার ক্ষুদ্র জলাশয় থেকে কয়েকশাে বর্গ কিলােমিটার পর্যন্ত হতে পারে । 

( vii ) জলাভূমি বছরে অন্তত পরপর সাতদিন জলমগ্ন থাকবে । 

( viii ) জলাভূমি বছরে অন্তত কিছুদিন জলজ উদ্ভিদ জন্মাবে এবং জলজ জীব পাওয়া যাবে ।

ভারতে জলাভূমির পরিমাণ 

ভারতে প্রায় 4.1 মিলিয়ন হেক্টর জলাভূমি আছে । এর মধ্যে প্রায় 1.5 মিলিয়ন হেক্টর প্রাকৃতিক এবং 2.6 হেক্টর মনুষ্য সৃষ্ট । এই জলাভূমিতে ধানের জমি এবং ম্যানগ্রোভ অঞ্চল ধরা হয়নি । 

জলাভূমির কার্যাবলী 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারের একটি দল ( US Army Corps of Engineers ) জলাভূমির 11 টি কার্য চিহ্নিত করেছেন এগুলি হল— 

( i ) ভৌমজলের ভাণ্ডার ( ground water ) পুনরুজ্জীবিতকরণ ( recharge ) । 

( ii ) ভৌমজলের ভাণ্ডার ( ground water ) বিমুক্তকরণ ( discharge ) । 

( iii ) জলের প্রবাহ পরিবর্তন করা ( Flood flow alteration ) । 

( iv ) পতিত বস্তুর স্থিতিকরণ ( Sediment stabilization ) । 

( v ) পতিত বস্তু / বিষাক্ত উপাদান ধারণ ( Sediment and toxicant retention ) । 

( vi ) পুষ্টি উপাদান দূরীকরণ এবং রূপান্তর ( Nutrient removal / transformation ) । 

( vii ) উৎপাদিত সামগ্রীর রপ্তানি ( Production export ) । 

( viii ) জলজ বৈচিত্র্যের ভাণ্ডারের আধিক্য রক্ষা ( Aquatic diversity / abundance ) । 

( ix ) বন্যজীবন বৈচিত্র্য / আধিক্য ( Wild life diversity / abundance ) । 

( x ) আমােদ প্রমােদ ( Recreation ) । 

( xi ) স্বকীয়তা / ঐতিহ্য ( Uniqueness / Heritage ) ।

জলাভূমির গুরুত্ব

( i ) জলাভূমিতে উদ্ভিদ এবং প্রাণী চাষ এবং শিকারের মাধ্যমে বহুলােকের জীবিকা নির্বাহ হয় । 

 ( ii ) জলাভূমির শুষ্ক অংশ চারণভূমি হিসাবে ব্যবহৃত হয় । 

( iii ) অতি বৃষ্টির জল ধরে রেখে জলাভূমি বন্যার ব্যাপকতা কমায় । 

( iv ) জলাভূমির নিজস্ব জীব বৈচিত্র্য থাকে এবং বছরের বিশেষ সময়ে বহু পরিযায়ী পাখি এখানে আশ্রয় নেয় । ভারতের বিভিন্ন জলাভূমিতে 318 রকমের বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা যায় । ম্যানগ্রোভ জলাভূমিতে অবস্থিত উদ্ভিদ বৈচিত্র্য মৃত্তিকার ভাঙন রােধ করে । 

( v ) জলাভূমি ময়লা জলের প্রাকৃতিক শােধনাগার হিসাবে কাজ করে । বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক এবং জৈবিক দূষক পদার্থের দূরীকরণে জলাভূমি বিশেষ ভূমিকা পালন করে । জলাভূমি CO2 শােষণ করে এবং জৈব ভূরাসায়নিক চক্র বজায় রাখতে সাহায্য করে । এই সব কারণে জলাভূমিকে প্রকৃতির বৃক্ক ( nature’s kidney ) বলা হয় ।

error: Content is protected !!