নাইট্রোজেন চক্র কাকে বলে

নাইট্রোজেন চক্র কাকে বলে

IMG ২০২১০৭০৫ ১৮০০৫১
নাইট্রোজেন চক্র কাকে বলে

যে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলির ফলে প্রকৃতিতে উপস্থিত নাইট্রোজেন , বায়ুমণ্ডল থেকে মৃত্তিকায় , মৃত্তিকা থেকে উদ্ভিদে , উদ্ভিদ থেকে প্রাণীদেহে , উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহ থেকে পুনরায় মৃত্তিকায় এবং মৃত্তিকা থেকে বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে । এই স্বতঃনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়াকে নাইট্রোজেন চক্র বলা হয় ।

নাইট্রোজেন চক্রের বিবরণ 

পরিবেশে নাইট্রোজেন চক্র মূলত দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয় ( I ) বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় নাইট্রোজেনের মাটিতে নাইট্রোজেন যুক্ত যৌগরূপে আবদ্ধ হওয়া অর্থাৎ নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ ( II ) মাটিতে নাইট্রোজেন যুক্ত যৌগরূপে আবদ্ধ নাইট্রোজেনের পরিবেশের বায়ুমণ্ডলের ফিরে যাওয়া বা নাইট্রোজেন বিমুক্তকরণ বা ডিনাইট্রিফিকেশন । 

বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় নাইট্রোজেনের মাটিতে নাইট্রোজেন যুক্ত যৌগরূপে আবদ্ধ হওয়া অর্থাৎ নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ

নাইট্রোজেন চক্রের এই পর্যায়টি নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলির মাধ্যমে ঘটে— 

ভৌত রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে : 

এই পদ্ধতিতে তড়িৎ মােক্ষণ বা বজ্রপাতের সময় বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় নাইট্রোজেন অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রথমে নাইট্রিক অক্সাইড ( NO ) এবং পরে অতিরিক্ত অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড গঠন করে । এই নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড জলীয় বাষ্প বা বৃষ্টির জলে দ্রবীভূত হয়ে নাইট্রাস অ্যাসিড ( HNO2 ) এবং নাইট্রিক অ্যাসিড গঠন করে । 

N2 + O2 = 2NO

2NO + O2 = 2NO2

2NO2 + H2O = HNO2 + HNO3

এই দু-প্রকার অ্যাসিড বৃষ্টির জলের সঙ্গে মাটিতে নেমে আসে এবং মাটিতে উপস্থিত বিভিন্ন খনিজ লবণের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নাইট্রেট ( NO3 ) যৌগ গঠন করে । স্বভােজী উদ্ভিদ মূলরােমের সাহায্যে এই নাইট্রেট যৌগ সংগ্রহ করে । 

স্বাধীনজীবী ব্যাকটেরিয়া এবং নীলাভ সবুজ শৈবাল দ্বারা : 

মৃত্তিকায় উপস্থিত স্বাধীনজীবী ব্যাকটেরিয়া যথা — অ্যাজোটোব্যাকটর , ক্লসট্রিডিয়াম এবং নীলাভ সবুজ শৈবাল যথা অ্যানাবিনা , নস্টক প্রভৃতি বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় নাইট্রোজেনকে নিজের দেহে নাইট্রোজেন যুক্ত জৈব যৌগরূপে আবদ্ধ করে । এই সকল ব্যাকটেরিয়ার মৃত্যুর পর এদের দেহে উপস্থিত নাইট্রোজেন যুক্ত জৈব যৌগ মাটিতে মিশে যায় এবং মাটিতে নাইট্রোজেনযুক্ত যৌগের পরিমাণ বৃদ্ধি করে । প্রতি বছরে একর প্রতি 10-20 কেজি নাইট্রোজেন মাটিতে সঞ্চিত হয় ।

মিথােজীবী ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা : 

ছােলা , মটর প্রভৃতি শিম্বগােত্রীয় উদ্ভিদের মূলে রাইজোবিয়াম নামক মিথােজীবী ব্যাকটেরিয়া অর্বুদ বা গুটি গঠন করে বাস করে । এই ব্যাকটেরিয়া বায়ুর মুক্ত নাইট্রোজেনকে নিজের দেহে নাইট্রোজেন ঘটিত যৌগরূপে আবদ্ধ করে , যার কিছু অংশ পােষক উদ্ভিদকে দেয় এবং বাকি অংশ নিজের দেহে সঞ্চয় করে রাখে । এই ব্যাকটেরিয়ার মৃত্যুর পর এর দেহে উপস্থিত নাইট্রোজেন যুক্ত যৌগ মাটিতে মিশে যায় এবং মাটির নাইট্রোজেন যুক্ত যৌগের পরিমাণ বৃদ্ধি করে । এইভাবে প্রতি বছরে একর প্রতি 45-100 কেজি নাইট্রোজেন মাটিতে সঞ্চিত হয় । 

অ্যামোনিফিকেশন :

যে প্রক্রিয়ায় মাটিতে উপস্থিত নাইট্রোজেন যুক্ত যৌগ অ্যামােনিয়ায় পরিণত হয় , তাকে অ্যামোনিফিকেশন বলে । মৃত জীবদেহে এবং প্রাণীদের রেচন পদার্থে উপস্থিত নাইট্রোজেন যুক্ত যৌগ ব্যাসিলাস , মাইক্রোকক্কাস প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়ায় সাহায্যে এই প্রক্রিয়ায় অ্যামােনিয়ায় পরিণত হয় । অ্যামােনিফিকেশান প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী ব্যাকটেরিয়াদের অ্যামােনিফাইং ব্যাকটেরিয়া বলে । 

নাইট্রিফিকেশন : 

যে প্রক্রিয়ায় মাটিতে উপস্থিত অ্যামােনিয়া নাইট্রেটে রূপান্তরিত হয় তাকে নাইট্রিফিকেশন বলে । এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে নাইট্রোসােমােনাস ব্যাকটেরিয়া অ্যামােনিয়াকে নাইট্রাইটে পরিণত করে এবং পরে নাইট্রোব্যাকটর ব্যাকটেরিয়া নাইট্রাইটকে নাইট্রেটে পরিণত করে । স্বভােজী জীবগােষ্ঠী প্রধানত মূলরােমের মাধ্যমে জলে দ্রবীভূত অবস্থায় এই নাইট্রেটকে সংগ্রহ করে এবং পরভােজী জীবগােষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে খাদ্যের মাধ্যমে স্বভােজী জীবগােষ্ঠী থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে । 

নাইট্রোজেন যুক্ত যৌগরূপে মাটিতে আবদ্ধ নাইট্রোজেনের বায়ুমণ্ডলে ফিরে যাওয়া বা নাইট্রোজেন বিমুক্তকরণ বা ডিনাইট্রিফিকেশন

নাইট্রোজেন চক্রের এই পর্যায়টিতে মাটিতে উপস্থিত নাইট্রেট যৌগ কতকগুলি ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা যথা : থায়ােব্যাসিলাল , সিউডােমােনাস প্রভৃতির মাধ্যমে গ্যাসীয় নাইট্রোজেনে পরিণত হয়ে বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে । এই প্রক্রিয়াকে ডিনাইট্রিফিকেশন বলে এবং এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী ব্যাকটেরিয়াগুলিকে ডিনাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া বলে ।

পরিবেশে নাইট্রোজেন চক্রের তাৎপর্য বা গুরুত্ব

( i ) পরিবেশে গ্যাসীয় নাইট্রোজেন এবং নাইট্রোজেন যুক্ত যৌগের পরিমাণ এই চক্রের মাধ্যমেই নির্দিষ্ট থাকে । 

( ii ) জীবের দেহ গঠনের ভৌত ভিত্তি অর্থাৎ প্রােটোপ্লাজমের অন্যতম মৌলিক গঠনগত উপাদান হল নাইট্রোজেন । নাইট্রোজেন চক্রের মাধ্যমেই জীবের নাইট্রোজেনের চাহিদার পূরণ হয় এবং জীবের অস্তিত্ব রক্ষা হয় ।

error: Content is protected !!