বাস্তুতন্ত্রের উপাদান

বাস্তুতন্ত্রের উপাদান

বিজ্ঞানী ওডাম ( Odum ) , 1966 খ্রিস্টাব্দে বাস্তুতন্ত্রের উপাদানগুলিকে দুভাগে বিভক্ত করেন । যেমন— ( 1 ) কার্যভিত্তিক উপাদান ( functional component ) , ( 2 ) সাংগঠনিক ভিত্তিক উপাদান ( structural component ) | 

কার্যভিত্তিক উপাদান

কার্যের ভিত্তিতে বাস্তুতান্ত্রিক উপাদান দুভাগে বিভক্ত । যেমন—

স্বভােজী উপাদান :

যারা নিজেদের খাদ্য ( স্ব ) উৎপাদন ও ভক্ষণ ( ভােজী ) করতে পারে তাদের স্বভােজী বলে । এই পৃথিবীতে একমাত্র সবুজ উদ্ভিদের এই ক্ষমতা আছে । তারা মাটি থেকে জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ শােষণ করে পাতায় প্রেরণ করে । পাতায় আছে ক্লোরােফিল । এই ক্লোরােফিল বায়ু থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড ( CO2 ) গ্রহণ করে এবং সকল জৈব ও অজৈব বস্তুর মাধ্যমে সৌরশক্তির সাহায্যে জটিল শর্করা খাদ্য তৈরি করে । যেমন— 

CO2 + H2O + সৌরশক্তি + উৎসেচক → গ্লুকোজ + O2। গ্লুকোজ ছাড়াও প্রােটিন , অ্যামাইনাে অ্যাসিড প্রভৃতি অতি প্রয়ােজনীয় উপাদানও সংশ্লেষিত হয় । উৎপাদক সবুজ উদ্ভিদ এই খাদ্যের কিছু নিজের প্রয়ােজনে ব্যবহার করে । উদ্বৃত্ত খাদ্য এবং প্রােটোপ্লাজম — শঠনকারী জীব ( ব্যাকটিরিয়া ) কর্তৃক ব্যবহৃত হয় । এভাবে সৌরশক্তির কিছু অংশ স্থিতিশক্তি রূপে সঞ্চিত হয় । অতএব পৃথিবীর সকল সবুজ উদ্ভিদই বাস্তুতন্ত্রের স্বভােজী জীব বা উৎপাদক । 

পরভােজী উপাদান :

যে সকল জীব পরকে ভােজন করে বেঁচে থাকে অর্থাৎ যারা নিজেদের খাদ্য নিজেরা তৈরি করতে পারে না তারাই পরভােজী । অর্থাৎ যে সকল জীব উৎপাদক বা স্বভােজী কর্তৃক উৎপাদিত যৌগের ব্যবহার , পুনর্বিন্যাস ও গঠনে সাহায্য করে তাদের পরভােজী বলে । কিছু ক্লোরােফিল বিহীন উদ্ভিদ এবং সকল প্রাণী প্রত্যক্ষ অথবা পরােক্ষভাবে উৎপাদকের উপর খাদ্যের জন্য নির্ভরশীল । তাই তারা পরভােজী ।

সাংগঠনিক ভিত্তিক উপাদান

সাংগঠনিক ভিত্তিতে বাস্তুতন্ত্র চারটি উপাদান নিয়ে গঠিত । যেমন— 

অজৈব উপাদান :

পরিবেশের জড় পদার্থ এবং তাদের বিভিন্ন প্রকার যৌগ নিয়ে অজৈব উপাদান গঠিত । এই যৌগগুলি আবার অজৈব এবং যৌগ রাসায়নিক উপাদান নিয়ে গঠিত । অজৈব রাসায়নিক উপাদানের মধ্যে জল , কার্বন ডাই – অক্সাইড , নাইট্রোজেন , ক্যালসিয়াম , ফসফেট ইত্যাদি যারা জীব-ভূ-রাসায়নিক চক্র হিসাবে প্রকৃতিতে আবর্তিত হয় । আবহাওয়া , উষ্ণতা , আলােক প্রভৃতি প্রকৃতির ভৌত পদার্থগুলিও অজৈব উপাদানের অন্তর্ভুক্ত । জলে দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে নানা প্রকার ধাতু ও গ্যাস এবং নিরবলম্বন হিসাবে থাকে নানা প্রকার জৈব পদার্থ । মাটির উপরের বায়ুমন্ডলে রয়েছে নানা প্রকার চক্র যেমন — কার্বন , নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেন চক্র । এগুলি নিয়ে বাস্তুতন্ত্রের অজৈব উপাদান গঠিত হয় । 

উৎপাদক :

বাস্তুতন্ত্রের স্বভােজী উপাদানকে অর্থাৎ উদ্ভিদকে প্রকৃতির উৎপাদক বলা হয় । কারণ এরা সালােকসংশ্লেষ পদ্ধতিতে শর্করা তৈরি করতে পারে । উৎপাদক আবার দুপ্রকার । অগভীর জলের ভাসমান উদ্ভিদ এবং স্থলের উদ্ভিদ । ভাসমান উদ্ভিদ আবার দুপ্রকারের — বড়াে আকারের ( macroscopic ) এবং আণুবীক্ষণিক ( microscopic ) । আণুবীক্ষণিক ভাসমান উদ্ভিদকে ফাইটোপ্লাঙ্কটন ( phytoplankton ) বলে । পুষ্করিণী , হ্রদ বা সমুদ্রের যে তল পর্যন্ত সূর্যালােক প্রবেশ করে সেই পর্যন্ত ফাইটোপ্লাঙ্কটনের বিস্তৃতি লক্ষ করা যায় । ফাইটোপ্লাঙ্কটন কিন্তু স্থলের বড়াে বড়াে উদ্ভিদ অপেক্ষা অধিক উৎপাদনশীল । 

খাদক :

যে সকল জীব নিজেরা খাদ্য সংশ্লেষ করতে পারে না কিন্তু উৎপাদকের উপর পরােক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল তাদের খাদক বলে । পরভােজী প্রাণীকুল এবং কিছু ক্লোরােফিলবিহীন উদ্ভিদ এই শ্রেণিতে পড়ে । খাদ্য স্বভাবের উপর নির্ভর করে এরা আবার কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত । যেমন— 

শাকাশী : যে সকল খাদক উৎপাদককে ভক্ষণ করে শক্তি সঞ্চয় করে তাদের শাকাশী বলে । শাকাশীরা সরাসরি উদ্ভিদ ভক্ষণ করে বলে এরা প্রথম স্তরের খাদক ( primary consumer ) । পুষ্করিণী বা হ্রদের জলে দুই স্তরের প্রাথমিক খাদক দেখা যায় । যেমন — ভাসমান আণুবীক্ষণিক প্রাণীকুল বা জুপ্লাঙ্কটন ( zooplankton ) এবং জলের ভিতরের শামুক , ক্লাস্টাসিয়া , মাছ প্রভৃতি ; এরা উৎপাদককে অর্থাৎ ফাইটোপ্লাঙ্কটনকে ভক্ষণ করে । এরা নিজ নিজ বসতি স্থানের প্রাথমিক খাদক । 

মাংসাশী : মাংসাশী প্রাণী প্রথম স্তরের খাদক ভক্ষণ করে শক্তি সঞ্চয় করে । তাই এরা দ্বিতীয় স্তরের খাদক ( Secondary consumer ) । দ্বিতীয় স্তরের খাদককে ভক্ষণ করে যারা শক্তি সঞ্চয় করে তারা তৃতীয় স্তরের খাদক । যেমন— 

উৎপাদক ( উদ্ভিদ ) → ১ ম খাদক ( খরগােস ) → ২ য় খাদক ( নেকড়ে ) → ৩ য় খাদক  ( সিংহ ) 

বিজ্ঞানী এলটন ( Elton ) 1930 খ্রিস্টাব্দে প্রাথমিক খাদক স্তরকে বাস্তুতন্ত্রের কী ইনডাসট্রি ( key industry ) নামে অভিহিত করেন । 

বিয়ােজক :

যে সকল অনুজীব মৃত উৎপাদক ও খাদকের জটিল যৌগকে শঠিত করে সরল পদার্থে পরিণত করে এবং ওই পদার্থ থেকে নিজেদের খাদ্য সংগ্রহ করে এবং উৎপাদকের প্রয়ােজনীয় কাঁচা রসদ ( raw materials ) সরবরাহ করে তাদের বিয়ােজক বলে ।

এরা উৎপাদক → বিভিন্ন স্তরের খাদক → বিয়ােজক এই খাদ্যশৃঙ্খল রচনা করে । বিয়ােজক সকল মৃত জীবদেহকে বিয়ােজিত করে সরল অজৈব পদার্থে রূপান্তরিত করে একটি পুষ্টির ভান্ডার ( nutrient pool ) গঠন করে । কার্যের উপর নির্ভর করে এদের প্রকৃতির কার্যকরী রাজ্য ( functional kingdom ) বলে ।

error: Content is protected !!