একটি আদর্শ ব্যাকটেরিয়ার গঠন

একটি আদর্শ ব্যাকটেরিয়ার গঠন 

Schematic of Escherichia coli structure3.ppm
একটি আদর্শ ব্যাকটেরিয়ার গঠন

ই.  কোলাই বা এশেরিকিয়া কোলাই গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া নামে পরিচিত । এরা মানুষের অন্ত্রে বসবাস করে । এদের মধ্যে কতকগুলি বিশেষ স্ট্রেনস্ ( strains ) মারাত্মক ধরনের উদরাময় রােগ ঘটিয়ে মানুষের জীবন বিপন্ন করে । এশেরিকিয়া কোলাই এর দেহকে দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত করা যায় , যেমন — দেহ আবরক ( Outer covering ) ও প্রোটোপ্লাস্ট ( Protoplast ) । 

দেহ আবরক ( Outer covering ) 

দেহকোশের বাইরের আবরক তিনটি স্তর নিয়ে গঠিত । 

স্লাইম স্তর বা ক্যাপসুল : ( slime layer or capsule ) :

কোশপ্রাচীরের বাইরে পুরু ও পিচ্ছিল পদার্থ দিয়ে তৈরি আবরণকে স্লাইম স্তর বলে । কোশ নিঃসৃত পদার্থ দিয়ে এই স্তর গঠিত হয় । এই স্লাইম স্তর শক্ত হয়ে প্রতিকুল পরিবেশে ক্যাপসুল গঠিত হয় । প্রধানত পলিস্যাকারাইড ও পলিপেপটাইড দিয়ে এই স্তর গঠিত । 

কাজ — কোশকে রক্ষা করা হল স্লাইম স্তরের প্রধান কাজ ।

কোশ প্রাচীর ( Cell wall ) :

ই. কোলাই একপ্রকার গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া । গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার কোশপ্রাচীর তুলনামূলক ভাবে পাতলা এবং ত্রিস্তর বিশিষ্ট । কোশপ্রাচীরের বাইরে সাইটোপ্লাজমীয় পর্দার নীচে প্রধানত লাইপো পলিস্যাকারাইড  ও ফসফোলিপিড থাকে । অন্তস্তরের কোশপ্রাচীরের মূল উপাদান হল 5-10% পেপটিডোগ্লাইকান ( Peptidoglycan ) । এতে কোনাে সেলুলােজ থাকে না । পেপটিডোগ্লাইকান এক প্রকার জটিল জৈব পদার্থ । এটি দুরকম অ্যামাইনাে শর্করা ( Amino sugar ) ও কিছু অ্যামাইনাে অ্যাসিড নিয়ে গঠিত । দুপ্রকার অ্যামাইনাে শর্করা হল এন-অ্যাসিটাইল গ্লুকোসামিন ( N-acetyl glucosamine ) এবং এন-অ্যাসিটাইল মিউরামিক অ্যাসিড ( N-acetylmuramic acid ) । এরা পর্যায়ক্রমিক ভাবে ( Alternately ) গ্লাইকোসাইডিক বন্ধনী ( glycosidic bond ) দিয়ে পর পর যুক্ত হয়ে গ্লাইকেন তন্তু ( Glycan strand ) গঠন করে । এই গ্লাইকেন তন্তুর প্রতিটি এন-অ্যাসিটাইল মিউরামিক অ্যাসিডের সঙ্গে চারটি অ্যামাইনাে অ্যাসিড , যেমন — এল-অ্যালানিন ( L-alanine ) , ডি-অ্যালানিন ( D-alanine ) , ডি-গ্লুটামিক অ্যাসিড ( D-glutamic acid ) , মেসাে-ডাই অ্যামাইনো পাইমেলিক অ্যাসিড ( Meso – diaminopimelic acid ) পেপটাইড বন্ধনী দিয়ে পর পর যুক্ত থাকে । কোশ প্রাচীরে একাধিক গ্লাইকেন তন্তু পাশাপাশি সমান্তরাল ভাবে অবস্থান করে । 

কোশ প্রাচীবের পেপটিডোগ্লাইকান এবং বাইরের সাইটোপ্লাজমীয় পর্দার মধ্যবর্তী স্থানে পেরিপ্লাজমিক অঞ্চল থাকে । এতে অনেকগুলি উৎসেচক ও বিপাকীয় বস্তু জমা হয়ে পেরিপ্লাজম গঠন করে । ই. কোলাই -এর কোশপ্রাচীর গ্রাম রঞ্জকে রঞ্জিত হয় না । 

কাজ — 1. কোশপ্রাচীর কোশের নির্দিষ্ট আকার গঠনে সহায়তা করে । 2. ব্যাকটেরিয়াকে বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে । 3. কোশপ্রাচীরের মধ্য দিয়ে দ্রবণগুলি সহজে সাইটোপ্লাজমীয় পর্দায় পৌঁছাতে পারে ।

কোশ পর্দা ( Cell membrane ) :

কোশপ্রাচীরের ভেতরে সাইটোপ্লাজমের চারদিকে সূক্ষ্ম , সক্রিয় একটি অর্ধভেদ্য পর্দা থাকে ! একে কোশ পর্দা বা সাইটোপ্লাজমীয় পর্দা বলা হয় । ফসফোলিপিড , প্রোটিন , পলিস্যাকারাইড ইত্যাদি দিয়ে এই পর্দা গঠিত হয় ।

কাজ — কোশের ভিতরে ও বাইরে দ্রবীভূত পদার্থের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে ও বিভিন্ন প্রকার জৈব প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে ।

প্রোটোপ্লাস্ট ( Protoplast )

কোশ পর্দা বা সাইটোপ্লাজমীয় পর্দার ভেতরের সব অংশকে প্রোটোপ্লাস্ট বলে । প্রােটোপ্লাস্ট সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লীয় বস্তু নিয়ে গঠিত । 

সাইটোপ্লাজম ( Cytoplasm ) :

নিউক্লীয় বস্তু ছাড়া অবশিষ্ট জেলির মতাে অর্ধতরল , অর্ধস্বচ্ছ , সমসত্ত্ব দানাদার অংশটিকে সাইটোপ্লাজম বলা হয় । সাইটোপ্লাজমের মধ্যে কার্বোহাইড্রেট , প্রােটিন ও খনিজ লবণ থাকে । সাইটোপ্লাজমে নিম্নলিখিত অংশগুলি থাকে , যেমন – 

( i ) রাইবােজোম — সাইটোপ্লাজমে কতকগুলি ক্ষুদ্র গােলাকার দানা যা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকে । এরা RNA ও প্রােটিন দিয়ে গঠিত এবং 70S প্রকৃতির । কাজ — প্রােটিন সংশ্লেষ এদের প্রধান কাজ ।

( ii ) মেসােজোম ( Mesosome ) — এই সাইটোপ্লাজমীয় পর্দাটি সাইটোপ্লাজমের মধ্যে প্রসারিত হয়ে ফাঁসের মতাে বা কুন্ডলীকৃত আকৃতির হয় । কাজ — কোশ বিভাজনের সময় বিভেদ প্রাচীর গঠন করা , DNA এবং প্রতিলিপি গঠনে সহায়তা করা , শ্বসনে সাহায্য করা ও বিভিন্ন জৈবিক কাজে অংশগ্রহণ প্রভৃতি এদের প্রধান কাজ । 

( iii ) গহ্বর ( Vacuole ) — সাইটোপ্লাজমে এক বা একাধিক ও বিভিন্ন আকৃতির গহ্বর থাকে । কাজ — এতে খাদ্য ও গ্যাস সঞ্চিত থাকে ।

( iv ) সঞ্চিত বস্তু ( Storage Product ) — সাইটোপ্লাজমে জমানো পদার্থ হল সঞ্চিত বস্তু , যেমন — শ্বেতসার , লিপিড , প্রোটিন , গ্লাইকোজেন , ভলিউটিন বা ফসফেট দানা , সালফার , ভিটামিন প্রভৃতি ।

নিউক্লিয় বস্তু ( Nuclear material ) :

নিউক্লিয়াসে নিউক্লিয় আবরণী , নিউক্লীয় জালিকা ও নিউক্লিওলাস থাকে না । তাই একে নিউক্লিওয়েড বলে । আদর্শ নিউক্লিয়াস যুক্ত কোশে ক্রোমােজোম বলতে যা বােঝায় ব্যাকটেরিয়ার কোশে ঠিক সেই রকম ক্রোমােজোম থাকে না । আদর্শ নিউক্লিয়াসের ক্রোমােজোমের DNA-এর সঙ্গে হিস্টোন ( Histone ) প্রােটিন যুক্ত থাকে কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার আদি নিউক্লিয়াসের DNA তে কোনাে হিস্টোন প্রােটিন থাকে না । তাই ব্যাকটেরিয়ার নগ্ন DNA কে জেনোফার বলে । প্রতিটি জেনোফারে কতকগুলি প্রােটিন ( RNA পলিমারেজ ) অণু দিয়ে ঘেরা একটি কেন্দ্রীয় মজ্জা থাকে । এসব প্রােটিন অণুতে কুন্ডলীকৃত ফাঁসের মতাে 12-80 টির মতাে DNA যুক্ত থাকে । কাজ — কোশের বিভাজন ঘটানাে , পরিব্যক্তি ( Mutation ) এবং বংশ পরম্পরায় সঞ্চারণ হল এর প্রধান কাজ । 

পিলি বা ফিমব্রি ( Pili or Fimbriae )

কোশ প্রাচীরের বাইরের দিকে ক্ষুদ্র সুতাের মতাে অসংখ্য উপাঙ্গ দেখা যায় । এদের পিলি বলে । পিলি দুরকমের হয় , যেমন অঙ্গজ পিলিযৌন পিলি । ব্যাকটেরিয়ার দেহে , প্রায় 100-400 পিলি থাকে । এরা পিলিন প্রােটিন দিয়ে গঠিত । কাজ — অঙ্গজ পিলি পােষক কোশের গায়ে আবদ্ধ হতে এবং যৌন পিলি যৌন জননের সময় দুটি ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে সাহায্য করে ।

ফ্ল্যাজেলা ( Flagella )

কোশ দেহে স্ট্রেন্স অনুযায়ী এক বা একাধিক ফ্ল্যাজেলা থাকে যা গমনে সাহায্য করে । 

প্রতিটি ফ্ল্যাজেলামের তিনটি অংশ থাকে , যেমন— ভিত্তিদেহ ( Bisal body ) , হুক ( Hook ) এবং সূত্র ( Filament ) । ভিত্তিদেহ কোশ আবরণীব অভ্যন্তরে আবদ্ধ থাকে । ভিত্তিদেহে চারটি বিভিন্ন দূরত্বে রিং ( Ring ) থাকে । হুকের নীচের অংশ কোশ প্রাচীরের মধ্যে থাকে এবং সূত্রটি কোশের বাইরে থাকে । কাজ — ফ্লাজেলা ব্যাকটেরিয়ার গমনে সাহায্য করে ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!