ব্যাকটেরিয়ার জনন পদ্ধতি

ব্যাকটেরিয়ার জনন পদ্ধতি  

images 9
ব্যাকটেরিয়ার জনন পদ্ধতি

ব্যাকটেরিয়া সাধারণত তিন ভাবে বংশ বৃদ্ধি করতে পারে , যেমন— অঙ্গজ জনন , অযৌন জনন এবং যৌন জনন

অঙ্গজ জনন ( Vegetative reproduction ) 

অনুকূল পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া অঙ্গজ জননের সাহায্যে বংশ বৃদ্ধি করে । সাধারণত দু’রকমের অঙ্গজ জনন দেখা যায় । যথা —  বিভাজন এবং মুকুলোদগম

বিভাজন ( Fission ) :

বিভাজন প্রক্রিয়া ব্যাকটেরিয়ার প্রধান অঙ্গজ জনন পদ্ধতি । সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার বিভাজন প্রক্রিয়াটি দ্বি-বিভাজন । প্রক্রিয়ার শুরুতেই মাতৃকোশটি কিছুটা লম্বা হয় এবং কোশপ্রাচীরের মাঝে একটি সংকোচন দেখা যায় । মাতৃকোশের জিনােমের ( DNA ) প্রতিলিপি ( Replication ) গঠিত হয় । DNA- এর প্রতিলিপি গঠনের সময় , গােল আকৃতির জিনােম বিভাজিত হয়ে দুটি গােলাকার DNA গঠন করে । এর পর খাঁজ বা সংকুচিত অংশটি ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং শেষে মাতৃকোশটি ভাগে ভাগ হয়ে যায় । এই দ্বিবিভাজন প্রক্রিয়া 20 থেকে 25 মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয় । অনুকূল অবস্থায় প্রতিটি অপত্য কোশ একইভাবে বিভক্ত হয়ে অসংখ্য বাকটেরিয়া সৃষ্টি করে ।

মুকুলোদগম ( Budding ) :

কতকগুলি ব্যাকটেরিয়া এই পদ্ধতিতে বংশ বৃদ্ধি করতে পারে । এই প্রক্রিয়াতে কোশ প্রাচীরের যে কোনাে একদিকে মুকুলের মতাে বেড়ে যায় । মাতৃ নিউক্লিয়াসের একটি খণ্ডাংশ ও প্রােটোপ্লাস্টের একটি অংশ মুকুলের মধ্যে যায় । মুকুলটি আস্তে আস্তে বড়াে হয় এবং পরে মাতৃকোশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় । উদাহরণ — রােডােসিউডােমােনাস

অযৌন জনন ( Asexual reproduction ) 

বিভিন্ন প্রকার অযৌন জনন প্রক্রিয়া ব্যাকটেরিয়াতে দেখা যায় । 

অ্যারথোস্পোর গঠন :

কতকগুলি ব্যাকটেরিয়া ছত্রাকের মতাে অনুসূত্র গঠন করে । এই অনুসূত্রগুলির শীর্ষে লম্বা দণ্ডের মতাে অ্যারথােস্পাের গঠিত হয়ে অনুসূত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন ব্যাকটেরিয়া গঠন করে । উদাহরণ— Actinomycetes ( অ্যাকটিনোমাইসিটিস ) ।

অন্তঃরেণু ( Endospore ) :

বহু ব্যাকটেরিয়াতে প্রতিকুল পরিবেশে ব্যাকটেরিয়ার দেহ কোশে একটি করে পুরু প্রাচীর যুক্ত রেণু গঠিত হয় । যে ব্যাকটেরিয়া কোশ অন্তঃরেণু গঠন করে সেই কোশকে স্পোরাঞ্জিয়াম বলে । অনুকূল পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া কোশ ফেটে অন্তঃরেণু বেরিয়ে আসে এবং নতুন ব্যাকটেরিয়া গঠন করে । 100°C তাপেও অন্তঃরেণুর জীবনী শক্তি অটুট থাকে । উদাহরণ- Clostridium ( ক্লসট্রিডিয়াম ) , Spirillum ( স্পাইরিলাম ) প্রভৃতি । 

কনিডিয়া ( Conidia ) :

কতকগুলি ব্যাকটেরিয়ার দেহ সুত্রাকার ও শাখাযুক্ত । এদের কনিডিয়ার মাধ্যমে অযৌন জনন ঘটে । এই ব্যাকটেরিয়ার দেহে কতকগুলি বিশেষ শাখা ( কনিডিওফোর ) গঠিত হয় । এই শাখার শীর্ষে কতকগুলি গােলাকার কনিডিয়া উৎপন্ন হয় । এরা পরপর শৃঙ্খলাকারে যুক্ত থাকে । পরে কনিডিয়াগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে অনুকূল পরিবেশে প্রত্যেকটি অপত্য ব্যাকটেরিয়া গঠন করে । উদাহরণ— Streptomyces ( স্ট্রেপটোমাইসিস ) । 

সিস্ট ( Cysts ) :

কতকগুলি ব্যাকটেরিয়া প্রতিকূল পরিবেশে কোশের চারপাশে পুরু প্রাচীর গঠন করে । এই অবস্থাকে সিস্ট বলে । অনুকূল পরিবেশে সিস্ট অঙ্কুরিত হয়ে নতুন ব্যাকটেরিয়া গঠিত হয় । উদাহরণ- Azotobacter ( অ্যাজোটোব্যাকটর ) ।

যৌন জনন ( Sexual reproduction ) 

1940 খ্রিস্টাব্দের আগে আমাদের ধারণা ছিল ব্যাকটেরিয়ার যৌন জনন প্রক্রিয়া ঘটে না । কিন্তু পরে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন ব্যাকটেরিয়ার যৌন জনন অর্থাৎ প্রজননিক বস্তুর আদানপ্রদান তিনটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে , যেমন — রূপান্তরভবন , সংযুক্তি এবং ট্রান্সডাকশন

রূপান্তরভবন বা ট্রান্সফরমেশন ( Transformation ) : 

কোনাে ব্যাকটেরিয়ার DNA যখন অন্য কোনাে ব্যাকটেরিয়া কোশের মধ্যে যায় এবং ওই DNA অংশটি কোশের জিনোমের মধ্যে প্রতিস্থাপন হয়ে নতুন বৈশিষ্ট্য যুক্ত ব্যাকটেরিয়ায় রুপান্তরিত হয় তখন এই ঘটনাকে রূপান্তরভবন বলে । ইংরেজ বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক গ্রিফিথ ( Frederick Griffith ) প্রথম এই প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন । তিনি Diplococcus pneumoniae ( ডিপ্লোকক্কাস নিউমোনি ) নামে ব্যাকটেরিয়ায় এই ঘটনা প্রথম লক্ষ করেন । এই ডিপ্লোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া দু’রকমের হয় । একধরনের ব্যাকটেরিয়ার কোশের চারদিকে মােটা স্তর বা ক্যাপসুল থাকে । এরা মারাত্মক নিউমােনিয়া রােগ সৃষ্টি করে । অন্য ধরনের ব্যাকটেরিয়াতে মােটা ক্যাপসুল থাকে না এবং এরা রােগ সৃষ্টি করে অর্থাৎ ক্ষতিকারক নয় । ক্যাপসুল যুক্ত মৃত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার DNA সংগৃহীত করে , জীবিত ক্যাপসুল বিহীন ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে মিশিয়ে দিলে দেখা যায় , এই DNA ক্যাপসুলবিহীন ব্যাকটেরিয়া গ্রহণ করে এবং কতকগুলি নতুন বৈশিষ্ট্য যুক্ত ব্যাকটেরিয়ায় রুপান্তরিত হয় । রূপান্তরিত ব্যাকটেরিয়ার প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য হল— ( a ) মােটা স্তর বা ক্যাপসুল গঠন । ( b ) রােগ সৃষ্টি করার ক্ষমতা অর্জন । 

অ্যাভেরী ( Avery ) , ম্যাকলিওড ( Macleod ) , ম্যাককার্টি ( McCarty ) প্রমুখ বিজ্ঞানীরা 1944 খ্রিস্টাব্দে প্রমাণ করেন যে , DNA -ই রূপান্তরভবনের প্রধান উপাদান । 

সংযুক্তি ( Conjugation ) :

দাতা পুরুষ ব্যাকটেরিয়া ও স্ত্রী ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে যৌন জননের সময় দাতা পুরুষ ব্যাকটেরিয়ার প্লাসমিড DNA- এর অপত্য প্রতিলিপি মিলন নালি দিয়ে স্ত্রী ব্যাকটেরিয়ায় যায় এবং পুরুষে রূপান্তরিত করে তাকে সংযুক্তি বলে ।

মার্কিন বিজ্ঞানী লেডারবার্গ ও টটাম ( Lederberg and Tatum ) 1946 খ্রিষ্টাব্দে Escherichia Coli ( এশেরিকিয়া কোলাই ) নামে ব্যাকটেরিয়াতে এই ধরনের যৌন জনন প্রক্রিয়া দেখতে পান । দু’ধরনের অর্থাৎ দু’প্রকার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যুক্ত E. Coli -র মধ্যে সমমিলন সংযুক্তি ঘটে । যৌন জননে অংশগ্রহণকারী দুটি E. Coli -র একটিকে দাতা এবং অন্যটিকে গ্রহীতা বলা হয় । দাতা ব্যাকটেরিয়ার নিউক্লিওয়েড DNA ছাড়া সাইটোপ্লাজমে একটি বিশেষ ধরনের প্লাজমিড DNA থাকে । একে উর্বরতা সম্পন্ন বা F- ফ্যাক্টর বলে । এই দাতা ব্যাকটেরিয়াকে F+ পুরুষ ব্যাকটেরিয়া বলে । গ্রহীতা ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে কোনাে প্লাজমিড DNA থাকে না । এই জন্যে একে F- স্ত্রী ব্যাকটেরিয়া বলে ।

দাতা ও গ্রহীতা ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে সংযুক্তির সময় উভয় ব্যাকটেরিয়ার কোশের মধ্যে একটি সংযুক্তি নালি গঠিত হয় । দাতা ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমিড DNA প্রতিলিপি গঠন করে এবং অপত্য প্রতিলিপি মিলন নালি দিয়ে গ্রহীতা ব্যাকটেরিয়াতে যায় । কিছুক্ষণ পরে কোশ দুটি বিচ্ছিন্ন হয় এবং গ্রহীতা বা স্ত্রী ব্যাকটেরিয়া F+ পুরুষে রূপান্তরিত হয় । 

ট্রান্সডাকশন ( Transduction ) : 

ভাইরাসের সাহায্যে একটি ব্যাকটেরিয়ার আংশিক বা খন্ডিত DNA অন্য ব্যাকটেরিয়ার DNA- এর সঙ্গে মিলিত হবার পদ্ধতিকে ট্রান্সডাকশন বলে । 

এখানে দেখা যায় একটি ভাইরাসের মাধ্যমে কোনো একটি ব্যাকটেরিয়া থেকে জেনেটিক পদার্থ অন্য একটি ব্যাকটেরিয়াতে স্থানান্তরিত হয় । বিখ্যাত বিজ্ঞানী জিন্ডারলেডারবার্গ ( Zinder and Lederberg ) 1952 খ্রিস্টাব্দে ব্যাকটেরিয়া কোশে ট্রান্সডাকশন প্রক্রিয়াটি আবিষ্কার করেন ।

এই পদ্ধতিতে দুটি ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে প্রজননিক বস্তুব ( DNA ) আদান প্রদান ঘটার সময় দৈহিক সংযুক্তি ঘটে না । প্রজননিক বস্তুর আদান প্রদান ফাজ ভাইরাসের সহায়তায় ঘটে । একটি ফাজ ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া কোশকে আক্রমণ করে এবং ফাজ DNA ব্যাকটেরিয়া কোশে যায় । ফাজ DNA বহু প্রতিলিপি গঠন করে । এই সময় আক্রান্ত ব্যাকটেরিয়ার DNA কতকগুলি খন্ডে ভেঙে যায় । এর পর যখন ভাইরাসের উপাদানগুলি যুক্ত হয়ে অপত্য ফাজ গঠিত হয় , তখন ব্যাকটেরিয়া DNA এর খন্ডাংশ ফাজের DNA এর সঙ্গে যুক্ত হয় । এই ফাজ যখন আবার নতুন অন্য ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে তখন ফাজ DNA ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় । মনে রাখতে হবে এই ফাজ DNA এর সঙ্গে আগের ব্যাকটেরিয়ার DNA এর খন্ডাংশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে । নতুন ব্যাকটেরিয়া কোশে এই ফাজ DNA প্রতিলিপি গঠন না করে সরাসরি ব্যাকটেরিয়ার DNA এর সঙ্গে যুক্ত হয় । এর ফলে নতুন বৈশিষ্ট্য যুক্ত অপত্য ব্যাকটেরিয়ার সৃষ্টি হয় । এইভাবে ভাইরাসের সাহায্যে একটি ব্যাকটেরিয়ার আংশিক বা খন্ডিত DNA অন্য ব্যাকটেরিয়া DNA এর সঙ্গে মিলিত হবার পদ্ধতিকে ট্রান্সডাকশন বলা হয় ।

2 thoughts on “ব্যাকটেরিয়ার জনন পদ্ধতি”

Leave a Comment

error: Content is protected !!