কিভাবে ভাইরাস জনিত রোগের সংক্রমণ ঘটে

কিভাবে ভাইরাস জনিত রোগের সংক্রমণ ঘটে  

সাধারণত ভাইরাস উদ্ভিদ , প্রাণী , মানুষ প্রভৃতিতে বিস্তার লাভ করে বহুরকম সংক্রামক রােগ সৃষ্টি করে । কোনাে জীবের মাধ্যমে রােগ ছড়ালে জীবটিকে বাহক বা ভেক্টর ( vector ) বলা হয় , যেমন— মশা , মাছি , আরশােলা প্রভৃতি । উদ্ভিদ ক্ষেত্রে দেখা যায় কতকগুলি উদ্ভিদ একই প্রকার ভাইরাসের দ্বারা বারবার আক্রান্ত হয় । একটি দেহকোশ আক্রান্ত হলে ওই উদ্ভিদের প্রতিটি কোশই আক্রান্ত হয়ে উদ্ভিদটি সম্পূর্ণভাবে রােগগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তা থেকে ক্রমাগত ভাইরাস অন্য উদ্ভিদে রােগ ছড়ায় । 

কিন্তু প্রাণীদের ক্ষেত্রে কিছুটা বৈচিত্র্য দেখা যায় । প্রাণীরা ভাইরাস দ্বারা রােগাক্রান্ত হলে ওই প্রাণীতে এক প্রকার অ্যান্টিবডি ( Antibody ) তৈরি হওয়ায় ওই রােগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কমে যায় । কীভাবে ভাইরাস রােগ বিভিন্ন উপায়ে সঞ্চারিত হয় তার বর্ণনা দেওয়া হল — 

উদ্ভিদের ভাইরাস রোগ সংক্রমণ  ( Transmission of Viral diseases in Plants ) 

যান্ত্রিক উপায়ে : ভাইরাস আক্রান্ত উদ্ভিদের পরিচর্যাকারীর পােশাক পরিচ্ছদ ও পরিচর্যায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ইত্যাদির সঙ্গে কোনােক্রমে সুস্থ উদ্ভিদের সংস্পর্শ হলেই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে । 

মৃত্তিকার সাহায্যে : গমের মোজাইক রােগ সৃষ্টিকারী ভাইরাসের মতাে অনেক ভাইরাসই মৃত্তিকার সাহায্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায় । প্রধানত এরা মূলের মাধ্যমে উদ্ভিদ দেহে প্রবেশ করে ।

বীজের সাহায্যে : সাধারণত উদ্ভিদের ফুল ভাইরাসে আক্রান্ত হলে বীজে সংক্রামিত হয় এবং বীজ থেকে অন্যত্র সংক্রামিত হয় । 

অঙ্গজ জননের মাধ্যমে : আক্রান্ত উদ্ভিদের সব অঙ্গই ভাইরাস সংক্রামিত হওয়ায় অঙ্গজ জননের ফলে নতুন উদ্ভিদের সৃষ্টি হলেও এতে রােগ সংক্রমণ ঘটে । এইভাবে কলম , বুলবিল , মুকুল , মৃদগত কাণ্ড প্রভৃতির সাহায্যে ভাইরাস অঙ্গজ জননের মাধ্যমে সংক্রামিত হয় । 

কীটপতঙ্গের সাহায্যে : বিভিন্ন প্রকারের কীটপতঙ্গ দিয়ে উদ্ভিদে ভাইরাস সংক্রামিত হয় । সাধারণত যারা উদ্ভিদের রস শােষণ করে তাদের দ্বারাই বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে । 

পরজীবী উদ্ভিদ দ্বারা : স্বর্ণলতা প্রভৃতি উদ্ভিদ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে এরা চোষক মূল দিয়ে ভাইরাস আশ্রয়দাতা উদ্ভিদের দেহে প্রবেশ করে । এছাড়া পরাগরেণু দিয়ে ভাইরাস সংক্রামিত হয় । 

প্রাণীদের ভাইরাস রোগ সংক্রমণ  ( Transmission of Viral diseases in Animals )

স্পর্শের মাধ্যমে : কাশি , হাঁচি , চুম্বন কিংবা কথা বলার সময় ভাইরাস আক্রান্ত দেহ থেকে সংক্রামিত হয় । 

বায়ুর সাহায্যে : প্রাণীদের দেহে বেশির ভাগই বায়ুর সাহায্যে সংক্রামিত হয় । বসন্ত , ইনফ্লুয়েঞ্জা , হাম প্রভৃতি প্রধানত বায়ুর মাধ্যমে সঞ্চারিত হয় । 

খাদ্য ও জলের মাধ্যমে : পােলিও , হেপাটাইটিস প্রভৃতি রােগের ভাইরাস খাদ্য ও জলের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটায় । 

কীট পতঙ্গের সাহায্যে : অধিকাংশ ভাইরাসই কীট পতঙ্গের সাহায্যে বিস্তারিত হয় । যেমন , মশা মারাত্মক ভাইরাস রোগ এনসেফালাইটিস ও ডিপথিরিয়া প্রভৃতি রােগের সংক্রমণ ঘটায় । 

গবাদি পশুর সাহায্যে : গৃহপালিত পশু , যেমন — ছাগল , গােরু , কুকুর , বেড়াল প্রভৃতির ভাইরাস ঘটিত রােগ সংক্রমণ প্রবণতা অত্যন্ত বেশি । তাই ভাইরাস রােগ দ্রুত জীবদেহে ছড়িয়ে পড়ে ।

ভাইরাস রােগ প্রতিরােধ ও নিয়ন্ত্রণ ( Prevention and Control of Viral diseases ) 

নিম্নলিখিত উপায় অবলম্বন করে ভাইরাসজনিত রােগ প্রতিরােধ বা নিয়ন্ত্রণ করা যায় ।

উদ্ভিদের ক্ষেত্রে ( In Plants ) : 

( i ) রােগাক্রান্ত উদ্ভিদ বা উদ্ভিদ অঙ্গ ধ্বংস বা জ্বালিয়ে দেওয়া । 

( ii ) রােগ প্রতিরােধী প্রজাতির বীজ রােপন করা । 

( iii ) রােগমুক্ত বীজ বা উদ্ভিদ অঙ্গ চাষের জন্য ব্যবহার করা । 

( iv ) কীটনাশক দ্রব্যাদির ব্যবহার করে উদ্ভিদকে পতঙ্গ মুক্ত করা । 

( v ) পৃথকীকরণ পদ্ধতি ( Quarantine ) অবলম্বন করা । 

( vi ) তাপ বা X-ray প্রয়ােগ করে ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করা । 

( vii ) কৃষিকার্যের সাজসরঞ্জামগুলি ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা । 

প্রাণীর ক্ষেত্রে ( In Animals ) : 

( i ) রােগ প্রতিষেধক টিকা ব্যবহার করা । 

( ii ) হাঁচি , কাশির সময় মুখে রুমাল চাপা দেওয়া । 

( iii ) পৃথকীকরণ পদ্ধতি অবলম্বন করা । 

( iv ) গৃহপালিত পশুকে প্রতিষেধক টিকা দেওয়া । 

( v ) জল ও খাদ্য সম্বন্ধে সতর্কতা অবলম্বন করা । 

ভাইরাস রোগ প্রতিরোধে ব্যাকটেরিওফাজের ভূমিকা

ব্যাকটেরিয়া ঘটিত আমাশয় , টাইফয়েড , প্লেগ , কলেরা প্রভৃতি রােগে ব্যাকটেরিয়া  ধ্বংসী ফাজ রােগ প্রতিরােধক ওষুধ হিসাবে অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে ব্যবহৃত হয় । এরা রােগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে রােগ প্রতিরােধ করে ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!