ভাইরাস কাকে বলে

ভাইরাস কাকে বলে

index 13
ভাইরাস কাকে বলে

ভাইরাস ( virus ) একটি ল্যাটিন শব্দ , যার অর্থ ‘ বিষ ’ ( poison ) । ভাইরাস একপ্রকার জীবকণা যা কেবল সজীব কোশেই নিজেদের অস্তিত্ব প্রকাশ করতে পারে । সজীব কোশের বাইরে এরা জড়ের মতাে আচরণ করে । তাই ভাইরাসকে জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ের বস্তু বলা হয় । ভাইরাসের একককে ভিরিয়ন ( virion ) বলা হয় । ভাইরাস এত ক্ষুদ্র যে কেবলমাত্র রেজলুশন ( resolution ) ক্ষমতা সম্পন্ন ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে এরা দৃশ্যমান । 

1892 খ্রিস্টাব্দে রুশ বিজ্ঞানী দিমিত্রি এ. আইভানােস্কি ( Dimitri A. Ivanowaski ) তামাক পাতার মােজেইক রােগের কারণ হিসেবে এমন এক সংক্রমণ বস্তুর কথা উল্লেখ করেছিলেন যা ব্যাকটেরিয়ার থেকেও ছােটো এবং ব্যাকটেরিয়া-ফিলটার দ্বারা ছাঁকা তরল পদার্থের মধ্যে থেকে ওই রােগ সৃষ্টি করতে সক্ষম । 1898 সালে ডাচ বিজ্ঞানী বেইজেরিঙ্ক ( M. W. Beijerinck ) প্রথম  ‘ ভাইরাস ‘ নামটি প্রবর্তন করেন ।

ভাইরাস এর সংজ্ঞা ( Definition of Virus )

নিউক্লীয় প্রােটিন নির্মিত , অতি ক্ষুদ্র , অকোশীয় , রােগ সৃষ্টিকারী , বাধ্যতামূলক পরজীবী , কেবলমাত্র পােষক কোশে প্রজননক্ষম , ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দৃশ্যমান জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ের বস্তুকে ভাইরাস বলা হয় ।

ভাইরাসের অবস্থান ( Occurrence of Virus ) 

ভাইরাস জল , মাটি , বায়ু সর্বত্রই অবস্থান করে । এরা বিভিন্ন গােষ্ঠীভুক্ত উদ্ভিদ ( শৈবাল , ছত্রাক , ফার্ন , ব্যক্তবীজী ও গুপ্তবীজী ) ও প্রাণীদেহে ( আদ্যপ্রাণী , পতঙ্গ , মাছ , উভচর , পক্ষী , স্তন্যপায়ী ও মানুষ ) পূর্ণ পরজীবীরূপে বাস করে এবং মারাত্মক রােগ সৃষ্টি করে । পােষক কোশের বাইরে নিষ্ক্রিয় জড় বস্তু রূপে অবস্থান করে এবং ভিতরে সক্রিয় ও সজীব হয়ে ওঠে ।

ভাইরাসের উৎপত্তি ( Origin of Virus ) 

ভাইরাসের গঠনগত দুটি মুখ্য উপাদান হল প্রােটিননিউক্লিক অ্যাসিড । এ থেকে অনুমান করা যায় যে ভাইরাসের উৎপত্তি জৈব অভিব্যক্তির পথেই ঘটেছে । বিজ্ঞানীদের মধ্যে ভাইরাসের উৎপত্তি সম্পর্কিত তিনটি মতবাদ প্রচলিত আছে ।  

অকোশীয় মতবাদ :

জৈব বিবর্তনের পথে কোশ উৎপত্তির সমসাময়িক কালে ভিন্ন পথ ধরে অকোশীয় কোনাে বস্তু থেকে ভাইরাসের উৎপত্তি ঘটেছে । 

পরজীবী মতবাদ :

এই মতবাদ অনুসারে ভাইরাস প্রথমে কোশীয় জীব ছিল কিন্তু দীর্ঘকাল পরজীবী হিসেবে বাস করে তাদের মধ্যে পরিবর্তন ও সরলীকরণ ঘটায় বর্তমানের ভাইরাসের উৎপত্তি ঘটেছে ।  

প্রজনন বস্তু মতবাদ :

কোশের প্রজনন বস্তুর খণ্ডাংশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ভাইরাস দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটায় । ফলে কোশের মৃত্যু ঘটে এবং ভাইরাস বাইরে চলে আসে । 

*** আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে জৈব বিবর্তনের শেষ পর্যায়ে নিউক্লীয়-প্রােটিন কণা থেকে প্রোটোভাইরাস এর উৎপত্তি ঘটে , পরবর্তী পর্যায়ে ভাইরাসের উদ্ভব ঘটে । নিউক্লীয় প্রোটিন → প্রােটোভাইরাস → ভাইরাস ।

ভাইরাসের প্রকৃতি ( Nature of Virus ) 

1. ভাইরাসের জীবনচক্রে দুটি দশা প্রধান — অন্তঃকোশীয় বহিঃকোশীয় । অন্তঃকোশীয় দশায় সজীব বস্তুর মতাে আচরণ করে । বহিঃকোশীয় দশায় সংক্রমণযােগ্য নিষ্ক্রিয় জড় বস্তুর মতাে আচরণ করে ।

2. প্রতিটি ভিরিয়ন কণার সংক্রমণ ক্ষমতা বহিঃকোশীয় দশায় বিদ্যমান ।

3. ভাইরাসের দেহে যে-কোনাে একপ্রকার নিউক্লিক অ্যাসিড থাকে । ভাইরাসের ক্ষেত্রে DNA দ্বিতন্ত্রী বা একতন্ত্রী হতে পারে , আবার RNA একতন্ত্রী বা দ্বিতন্ত্রী হতে পারে । 

4. ভাইরাস পােষক কোশে প্রবেশের পর নিজেদের বংশ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে নিউক্লিক অ্যাসিডের সাহায্যে ।

5. ভাইরাস পােষক কোশ ছাড়া বংশ বিস্তার করতে পারে না , তাই ভাইরাসকে বাধ্যতামূলক পরজীবী বলে । 

6. ভাইরাসে সাইটোপ্লাজম , রাইবােজোম , প্রােটিন সংশ্লেষ , বিপাক ক্রিয়া অনুপস্থিত ।

7. ভাইরাসের মধ্যে স্বল্প দু-একটি উৎসেচক এর উপস্থিতি লক্ষণীয় । 

8. ভাইরাসের আয়তন বৃদ্ধি ঘটে না , উত্তেজনায় সাড়া দেয় না এবং চলন ক্ষমতা নেই ।

9. বিশুদ্ধ ভাইরাস কণাকে কেলাসিত করা যায় । 

10. বহু বছর সংরক্ষণ করার পরেও ভাইরাসের সক্রিয়তা বজায় থাকে ।

ভাইরাসের আকার ( Shape of Virus ) 

গােলাকার ( Spherical ) :

এই প্রকার ভাইরাস প্রধানত গােলাকার হলেও পরস্পরের মধ্যে স্বল্প আকৃতিগত তারতম্য দেখা যায় । রাইনোভাইরাস , ইনফ্লুয়েঞ্জা , পােলিয়াে , টিউমার , এনকেফালাইটিস , মাম্পস প্রভৃতি রােগের ভাইরাস গােলাকার । এদের ব্যাস 10nm-250nm পর্যন্ত হয় ।

দন্ডাকার ( Rod shaped ) :

টোবাকো মোজাইক ভাইরাস , আলুর ব্লাইট , আলফালফা , মোজাইক ভাইরাস প্রভৃতি দন্ডাকার ভাইরাস । এদের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে 300nm এবং 18nm এর মধ্যে ।

ঘনকাকার ( Cuboidal ) : 

ভ্যাকসিনিয়া , ভ্যারিওলা প্রভৃতি বসন্ত রােগের ভাইরাস , হারপিস ভাইরাস এই আকৃতি বিশিষ্ট । এদের আয়তন সাধারণত 100nm-300nm হয় ।

শুক্রাণু বা ব্যাঙাচি আকার ( Spermatozoid or Tadpole like ) :

ব্যাকটেরিয়া আক্রমণকারী ফাজ ভাইরাস T2 , বা T4 , এই আকৃতি বিশিষ্ট । এদের দেহ মস্তক ও পুচ্ছ অংশ নিয়ে গঠিত । মস্তক সাধারণত 95nm x 65nm এবং পুচ্ছ 110nm x 25nm আয়তনের হয় ।

*** সবচেয়ে ছােটো আয়তনের ভাইরাস : রাইনোভাইরাস —10nm ব্যাস যুক্ত । 

*** সবচেয়ে বড়াে প্রাণী ভাইরাস : বসন্ত ভাইরাস ( ভ্যাকসিনিয়া , ভ্যারিওলা ) –300nm – 350nm ।

*** বৃহত্তম উদ্ভিদ ভাইরাস : বিট ইয়েলো ভাইরাস –1250nm x 40nm ।

ভাইরাসের প্রতিসাম্য ( Symmetry of Virus ) 

ভাইরাস ক্যাপসিডে ক্যাপসসামিয়ারের বিন্যাস ( প্রতিসাম্য ) অনুযায়ী ভাইরাসকে প্রধানত দু ভাগে ভাগ করা হয়— 

ঘনকাকার ( Cuboidal icosahedral ) :

এক্ষেত্রে ক্যাপসিড অংশ অনেকগুলি বহুভুজাকার খণ্ডক জুড়ে তৈরি হয় । যথা অ্যাডিনাে ভাইরাস , ভ্যাকসিনিয়া , হারপিস ভাইরাসে ক্যাপসিড 20 টি ত্রিভুজাকৃতি তল দিয়ে তৈরি , একে বিংশতি তলক ( Icosahedral ) বলে ।

সর্পিলাকার ( Helical ) : 

এক্ষেত্রে ক্যাপসিডে ক্যাপসসামিয়ার গুলি নিউক্লিক অ্যাসিডের সাথে সর্পিলাকারে বিন্যস্ত থাকে । যথা TMV , ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস । 

অনেক সময় ভাইরাসের দেহে দুরকম গঠন বিন্যাস দেখা যায় , যেমন — ব্যাকটেরিওফাজ T2 , T5 ভাইরাসের মস্তক ঘনকাকার এবং পুচ্ছ সর্পিলাকার । এরকম ভাইরাসকে ডুয়াল ভাইরাস ( dual virus ) বলে ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!