ভারতের জলসেচ পদ্ধতি

ভারতের জলসেচ পদ্ধতি

images 1
ভারতের জলসেচ পদ্ধতি

ভূগর্ভের জলস্তর , ভূপ্রকৃতি , মাটি , উষ্ণতা , বৃষ্টিপাত প্রভৃতির পার্থক্যের জন্য ভারতের বিভিন্ন অংশে প্রধানত তিনটি পদ্ধতিতে জলসেচ করা হয় । যথা— ( ১ ) কূপ ও নলকূপ , ( ২ ) জলাশয় এবং ( ৩ ) সেচখাল ।

কূপ ও নলকূপ 

ভারতের মােট সেচসেবিত অঞ্চলের প্রায় ৩৮ শতাংশে কূপ ও নলকূপের মাধ্যমে জলসেচ করা হয় । উত্তর ভারতের যেসব এলাকায় পলিমাটি আছে , সেখানে বৃষ্টির জল মাটির স্তর ভেদ করে মাটির নীচে গিয়ে সঞ্চিত হয় । বহু জায়গায় ভূগর্ভের ওই জল বা ভৌমজল ( underground water ) কূপ ও নলকূপের মাধ্যমে তুলে এনে কৃষিকাজে ব্যবহার করা হয় । কূপ ও নলকূপের গভীরতা ভূগর্ভের জলস্তরের ওপর নির্ভর করে । জলস্তর যদি ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকে তাহলে গভীরতা কম হয় । 

কূপ :

কূপের চারপাশ সাধারণত বাঁধিয়ে নেওয়া হয় এবং তার মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিটার নীচে জল থাকে । কপিকলের সাহায্যে কূপ থেকে ওই জল তােলা হয় । অবশ্য অনেক সময় এজন্য পারসিক চাকাও ( Persian wheel ) ব্যবহৃত হয় । এতে কূপের ওপর একটি চাকার গায়ে অনেকগুলি বালতি লাগানাে থাকে চাকাটিতে দড়ি বেঁধে গরু বা উটের মাধ্যমে ঘােরানাে হলে বালতিগুলি একের পর এক জল ভরে ওপরে উঠে আসে । 

নলকূপ :

নলকূপ দু-ধরনের হয় । 

( i ) সাধারণ নলকূপ — সাধারণ নলকূপ অগভীর হয় এবং এ থেকে হাত দিয়ে পাম্প করে জল তােলা হয় । 

( ii ) বৈদ্যুতিক নলকূপ — গভীর নলকূপ থেকে বৈদ্যুতিক পাম্প বা ডিজেল চালিত পাম্পের সাহায্যে জল তােলা হয় । এতে স্বল্প সময়ে প্রচুর জল তােলা যায় । 

উত্তর ভারতের সমভূমি অঞ্চলের পাঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশ এবং পূর্ব ভারতের বিহার , পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে কূপ ও নলকূপের প্রচলন বেশি । গুজরাত , মহারাষ্ট্র , তামিলনাড়ু প্রভৃতি রাজ্যেও এই পদ্ধতিতে কিছু কিছু জলসেচ করা হয় ।

পুকুর বা জলাশয়

ভারতের সেচ নির্ভর কৃষিজমির শতকরা প্রায় ১৫ ভাগে জলাশয় পদ্ধতির মাধ্যমে জলসেচ করা হয় । দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে মাটির নীচে অধিকাংশ জায়গায় অপ্রবেশ্য শিলাস্তর থাকায় বৃষ্টির জল ভূগর্ভে বিশেষ সঞ্চিত হয় না । তবে এখানকার ভূপৃষ্ঠ তরঙ্গায়িত বলে বর্ষার জল সহজেই নিম্নভূমিতে ধরে রাখা যায় । এছাড়া ভারতের যেসব অঞ্চলে নিয়মিত বৃষ্টিপাত হয় না , সেখানে জলাশয় নির্মাণ করে ও পুষ্করিণীতে জল জমিয়ে রাখা হয় এবং তারপর ডােঙা , পাম্পিং মেশিন প্রভৃতির সাহায্যে ওই জল ব্যাপকভাবে সেচকার্যে ব্যবহার করা হয় । 

দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ , কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুতে জলাশয় পদ্ধতির প্রচলন বেশি । পশ্চিমবঙ্গ , ওড়িশা , অসম , বিহার , ঝাড়খণ্ড প্রভৃতি রাজ্যে জলাশয়ের মাধ্যমে সামান্য জলসেচ করা হয় ।

সেচ খাল 

প্রধানত নদনদী বা জলাধারের জল কৃষিজমিতে ব্যবহারের জন্য যে খাল খনন করা হয় , তাকেই বলে সেচ খাল । এই খাল দুই প্রকার — প্লাবন খালনিত্যবহ খাল । 

ভারতীয় কৃষিতে এই খাল দ্বারা জলসেচের উপযােগিতা অপরিসীম । এর কারণ— 

( ১ ) ভারত নদীমাতৃক দেশ , অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন অংশের ওপর দিয়ে অসংখ্য নদনদী প্রবাহিত হয়েছে । এর ফলে এখানকার অধিকাংশ জায়গায় খাল খনন করে কৃষিজমিতে জলসেচ করা যায় । 

( ২ ) সুবিস্তৃত উত্তর ভারতের নদীগুলি বরফগলা জলে পুষ্ট বলে এগুলিতে সারাবছর জল থাকে এবং তাই প্রায় সমগ্র উত্তর ভারতেই সারাবছর খাল দ্বারা জলসেচ করা যায় । 

( ৩ ) ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সমভূমি থাকায় সহজে খাল খনন করে জলসেচ করা যায় । 

( ৪ ) দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভূমির ঢাল সুষম বলে খাল দিয়ে সহজেই জল প্রবাহিত হতে পারে । ( যেমন — সমভূমি অঞ্চলে ) । 

( ৫ ) দক্ষিণ ভারতে বরফগলা জলে পুষ্ট নদী থাকলেও ওখানকার ভূমিরূপ ঢেউ খেলানাে বলে সহজেই বাঁধ দিয়ে জলাধার নির্মাণ করা যায় এবং তারপর ওগুলি থেকে খাল খনন করে জলসেচ করা হয় । 

( ৬ ) দেশের অধিকাংশ জায়গাতেই এখন ভূগর্ভস্থ জলস্তর দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে । এরকম এক পরিস্থিতিতে ভূপৃষ্ঠস্থ জল অর্থাৎ নদনদীর জলধারা খালের মাধ্যমে কৃষিকাজে ব্যবহার করা ছাড়া আমাদের কৃষির উন্নতিবিধান বা জল সম্পদ সংরক্ষণের আর কোনাে বিকল্প নেই । 

সবশেষে বলা যায় , খাল দ্বারা জলসেচের উপযােগিতা এতটা বেশি বলেই বর্তমান ভারতের মােট সেচসেবিত কৃষিজমির সর্বাধিক অংশে ( প্রায় ৪০ শতাংশ ) খালের মাধ্যমে জলসেচ করা হয় ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!