ভারতের মৃত্তিকার শ্রেণীবিভাগ

ভারতের মৃত্তিকার শ্রেণীবিভাগ

india map of soils
ভারতের মৃত্তিকার শ্রেণীবিভাগ

ভূত্বকের ওপরের স্তরে যে সূক্ষ্ম পদার্থের শিথিল নরম স্তর আছে এবং যেখানে গাছপালা জন্মাতে পারে তাকেই বলে মাটি । প্রধানত শিলাচূর্ণ এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ থেকে মাটি সৃষ্টি হলেও মাটি গঠনে জলবায়ুর ভূমিকা খুব বেশি । কারণ শিলার বিচূর্ণীভবন ও ক্ষয় এবং উদ্ভিদের সৃষ্টি ও প্রকৃতি — এ দুটি প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে নির্ভর করে জলবায়ুর ওপর ।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে শিলার প্রকৃতি , উদ্ভিদ ও জলবায়ুর পার্থক্যের জন্য প্রধানত সাত ধরনের মাটি দেখা যায় , এগুলি হল— ( ১ ) পলিমাটি , ( ২ ) কালাে মাটি , ( ৩ ) লাল মাটি , ( ৪ ) ল্যাটেরাইট মাটি , ( ৫ ) মরু অঞ্চলের মাটি , ( ৬ ) পার্বত্য মাটি , ( ৭ ) উপকূলের লােনা মাটি । 

পলিমাটি 

ভারতের শতকরা প্রায় ৪৬ ভাগ স্থানে পলিমাটি আছে । এই মাটিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়— ( i ) নদী উপত্যকার পলিমাটি এবং ( ii ) উপকূলের পলিমাটি । 

নদী উপত্যকার পলিমাটি : 

নদীবাহিত পলি , বালি , কাদা প্রভৃতি উপত্যকায় সঞ্চিত হয়ে এই মাটি সৃষ্টি হয় । এর মধ্যে নদীর কাছাকাছি অঞ্চলের প্লাবনভূমিতে নতুন পলি দেখা যায় । গঙ্গা সমভূমিতে এই নতুন পলিমাটিকে খাদর বলে । প্রতি বছর নতুন পলি সঞ্চিত হওয়ায় খাদর খুব উর্বর হয় । 

অপরদিকে , নদী থেকে কিছুদূরে পুরোনাে পলিমাটি দেখা যায় । পুরােনাে পলিমাটির আর এক নাম ভাঙ্গারগঙ্গা , সিন্ধু , ব্রহ্মপুত্র প্রভৃতি নদনদীর বিস্তীর্ণ উপত্যকা জুড়ে পলিমাটি দেখা যায় । ভারতের কৃষিতে এই মাটির গুরুত্ব খুব বেশি , কারণ এই মাটিতে প্রচুর পরিমাণে ধান , গম , পাট , তুলাে , আখ , ডাল , তেলবীজ , তামাক প্রভৃতি উৎপন্ন হয় । 

উপকূলের পলিমাটি :

প্রধানত সমুদ্রবাহিত পলি সঞ্চিত হয়ে এই মাটি সৃষ্টি হয় । এর মধ্যে বালি ও লবণের পরিমাণ বেশি থাকে এবং এর উর্বরাশক্তি মাঝারি ধরনের । ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলে এই মাটি আছে । এই মাটিতে নারকেল ও সুপারি গাছ খুব ভালাে জন্মায় । 

কালাে মাটি 

লাভা থেকে সৃষ্ট ব্যাসল্ট শিলা ক্ষয় হয়ে এই মাটি উৎপন্ন হয়েছে । ব্যাসল্ট শিলার রং কালাে বলে এই মাটির রংও কালাে । এই মাটির আর এক নাম রেগুর । এই মাটি খুব উর্বর এবং চাষ-আবাদও ভালাে হয় । বিশেষত তুলাে চাষ খুব ভালাে হয় বলে এই মাটিকে অনেকে কালাে তুলাে মাটি বলেন । দাক্ষিণাত্য মালভূমির উত্তর-পশ্চিমাংশে মহারাষ্ট্র মালভূমি , গুজরাতের ব্রোচ , ভাদোদরা ও সুরাত , মধ্যপ্রদেশের পশ্চিমাংশ এবং কর্ণাটকের উত্তরাংশে এই মাটি দেখা যায় ।

লাল মাটি 

প্রাচীন গ্রানাইট , নিস্ প্রভৃতি আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা ক্ষয় হয়ে এই মাটি উৎপন্ন হয় । মাটিতে লৌহকণার ভাগ বেশি থাকে বলে এর রং লাল হয় । এই মাটির জল ধরে রাখার ক্ষমতা কম এবং বিশেষ উর্বর নয় । দাক্ষিণাত্য মালভূমির অন্তর্গত তামিলনাড়ু , কর্ণাটক , অন্ধ্রপ্রদেশ , ওড়িশা প্রভৃতি রাজ্যের মালভূমি অঞ্চলে , ঝাড়খণ্ডের ছােটোনাগপুর মালভূমিতে , উত্তর-পূর্ব ভারতের পার্বত্য অঞ্চলে ও মেঘালয় মালভূমিতে লাল মাটি দেখা যায় ।

ল্যাটেরাইট মাটি 

ল্যাটেরাইট মৃত্তিকাকে লাল কাঁকুরে মাটিও বলা হয় । এই মাটিতে লােহা ও অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড বেশি থাকে । কাঁকরের মতাে বলে এর জল ধরে রাখার ক্ষমতা থাকে না , তাই উর্বরও নয় । পশ্চিমঘাট , নীলগিরি , কার্ডামম প্রভৃতি পার্বত্য অঞ্চলে , ওড়িশার পাহাড়ি অঞ্চলে , ঝাড়খণ্ডের ছােটোনাগপুর মালভূমিতে এই মাটি দেখা যায় । 

মরু অঞ্চলের মাটি 

শুষ্ক অঞ্চলে এই মাটি দেখা যায় । এই মাটিতে বালির ভাগ বেশি থাকে । বৃষ্টিপাত খুব কম হয় বলে খনিজ পদার্থগুলি দ্রবীভূত হয়ে মাটির নীচের স্তরে চলে যায় না , ওপরেই থাকে । উদ্ভিদ বিরল অঞ্চল বলে মাটিতে জৈব পদার্থ থাকে না বললেই চলে । রাজস্থানের মরু অঞ্চল এবং গুজরাতের কচ্ছ ও কাথিয়াবাড়ের উত্তরাংশে এই মাটি দেখা যায় । 

পার্বত্য মাটি 

ভূমির ঢাল বেশি বলে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের মাটি অগভীর । এর মধ্যে যেসব এলাকা অরণ্যময় , সেখানকার মাটিতে বেশি পরিমাণে জৈব পদার্থ বা হিউমাস থাকে । পর্বতের ওপর দিকে যেখানে হিমবাহ নামে , সেখানে হিমবাহের মােরেন সৃষ্ট একপ্রকার মাটি দেখা যায় । 

উপকূলের লােনা মাটি 

সমুদ্র উপকূলের নিকটবর্তী নীচু জায়গাগুলির মাটি লােনা । প্রতিদিন জোয়ারের সময় সমুদ্রের লােনা জল চলে আসে বলে মাটি লবণাক্ত হয়ে যায় । এই মাটিতে সূক্ষ্ম পলি , কাদা প্রভৃতি থাকে । পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চল , কচ্ছের রাণ অঞ্চল , মহানদী , গােদাবরী প্রভৃতি নদীর বদ্বীপের কিছু স্থানে এই মাটি দেখা যায় ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!