ভারতের ঋতুচক্র

ভারতের ঋতুচক্র

মৌসুমি বায়ুর আগমন এবং প্রত্যাগমন , সারা বছরের বৃষ্টিপাত , উষ্ণতা , বায়ুর চাপ প্রভৃতি লক্ষ করে ভারত সরকারের আবহাওয়া বিভাগ ভারতের জলবায়ুকে চারটি ঋতুতে ভাগ করেছে —

[ ১ ] শীতকাল 

[ ২ ] গ্রীষ্মকাল 

[ ৩ ] বর্ষাকাল বা মৌসুমি বায়ুর আগমনকাল 

[ ৪ ] শরৎকাল বা মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাগমনকাল 

শীতকাল ( ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ) 

এই সময় সূর্য দক্ষিণ গােলার্ধে থাকায় সূর্যরশ্মি দক্ষিণ গােলার্ধে লম্বভাবে এবং উত্তর গােলার্ধে তির্যকভাবে পড়ে । শীতকালে মধ্য এশিয়ার শীতল স্থলভাগ বা উচ্চচাপ এলাকা থেকে শীতল ও শুষ্ক উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু ভারতের ওপর দিয়ে দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে বয়ে চলে । উত্তর ভারতে এসময় তাপমাত্রা হয় গড়ে ১০° থেকে ১৫° সেন্টিগ্রেড । ক্রমশ দক্ষিণে এই উত্তাপ বেড়ে তামিলনাড়ুতে গড়ে ২৫° সেন্টিগ্রেড হয় । উত্তর-পশ্চিম ভারত ও তামিলনাড়ুর উপকূল ছাড়া শীতকালে ভারতের অন্যান্য এলাকায় বৃষ্টিপাত বিশেষ হয় না । 

গ্রীষ্মকাল ( মার্চ থেকে মে ) 

মার্চের শেষ থেকেই সূর্য বিষুবরেখা পেরিয়ে ক্রমশ উত্তর গােলার্ধে লম্বভাবে কিরণ দিতে শুরু করে । তাই মার্চের শেষ ভাগ থেকেই ভারতে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে । মে মাসে সূর্য আরও উত্তরে ক্রমশ কর্কটক্রান্তি রেখার কাছে সরে আসে , ফলে উষ্ণতা আরও বেড়ে যায় । মে মাসে মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাতের গড় তাপমাত্রা ৩৮° থেকে ৪০° সেন্টিগ্রেড হয় । রাজস্থানের মরু অঞ্চলে তাপমাত্রা বেড়ে হয় প্রায় ৪৮০ সেন্টিগ্রেড । তবে উপকূল অঞ্চলে সমুদ্র সান্নিধ্যের জন্য উ‌ষ্ণতা এতটা বাড়ে না । উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রচণ্ড উষ্ণতার জন্য দিনের বেলা গরম বাতাস ‘ লু ’ প্রবাহিত হয় ।

গ্রীষ্মকালে ভারতে সামান্যই বৃষ্টিপাত হয় । দেশের বিভিন্ন অংশে কতকগুলি স্থানীয় নিম্নচাপ সৃষ্টি হয় । তার ফলে ঝড়াে বাতাস ও বজ্রবিদ্যুৎ সহ কিছু বৃষ্টিপাত হয় । এই ঝড়কে পশ্চিমবঙ্গে কালবৈশাখী , বিহার ও উত্তরপ্রদেশে আঁধি , অসমে বরদইছিলা এবং দক্ষিণ ভারতে আম্রবৃষ্টি বলে । 

বর্ষাকাল বা মৌসুমি বায়ুর আগমনকাল ( জুন থেকে সেপ্টেম্বর ) 

গ্রীষ্মকালে রাজস্থানের মরু অঞ্চলে যে গভীর নিম্নচাপ বলয়ের সৃষ্টি হয় , তার আকর্ষণে সুদূর ভারত মহাসাগর থেকে আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ছুটে আসে । দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমনে শুরু হয় বজ্রবিদ্যুৎ সহ প্রবল বৃষ্টিপাত । এইভাবে বর্ষাকাল শুরু হয় বলে একে মৌসুমি বিস্ফোরণ বলে । দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে ভারতে প্রবেশ করে— ( i ) আরব সাগরীয় শাখা এবং ( ii ) বঙ্গোপসাগরীয় শাখা । 

আরব সাগরীয় শাখা : 

পশ্চিমঘাট পর্বতমালার পশ্চিম ঢালে প্রথম বাধা পায় বলে পশ্চিম উপকূলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় । ওই পর্বতের পূর্ব ঢালে অবস্থিত দাক্ষিণাত্যের অভ্যন্তরভাগ বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল বলে ওই অংশে বৃষ্টিপাত কম হয় । আরব সাগরীয় শাখার কিছু অংশ গুজরাত ও রাজস্থানের ওপর দিয়েও প্রবাহিত হয় । 

বঙ্গোপসাগরীয় শাখা : 

পূর্ব হিমালয় ও পূর্ব ভারতের পার্বত্য অঞ্চলে প্রথম বাধা পায় বলে ওই অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় । মেঘালয়ের খাসি পাহাড়ের দক্ষিণ ঢালে মৌসিনরামে পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাত হয় বার্ষিক প্রায় ১,২৫০ সেমি । তারপর এই শাখার কিছু অংশ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ধরে পূর্বদিকে এবং কিছু অংশ বিহার ও উত্তরপ্রদেশের ওপর দিয়ে পশ্চিমদিকে এগিয়ে যায় । 

দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে পশ্চিম উপকূলে এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের পার্বত্য অঞ্চলে ২০০ সেন্টিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত হয় । উত্তর-পশ্চিম ভারতের একমাত্র মরু অঞ্চল ছাড়া অন্যান্য স্থানে ৬০ থেকে ২০০ সেমি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয় । বর্ষাকালে উত্তর ভারতে তাপমাত্রা হয় গড়ে ২০° থেকে ২৫° সেন্টিগ্রেড এবং দক্ষিণ ভারতে গড়ে ২০° থেকে ৩০° সেন্টিগ্রেড । 

শরৎকাল বা মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাগমনকাল ( অক্টোবর থেকে নভেম্বর ) 

বার্ষিক আপাত গতি অনুসারে এসময় সূর্য বিষুবরেখা পেরিয়ে মকরক্রান্তির দিকে সরতে থাকে । এই সময় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুও ভারত থেকে প্রত্যাগমন করে । এই বিদায়ী বা প্রত্যাবর্তনকারী দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ভারতের উপকূল অঞ্চলে মাঝে মাঝে ঘূর্ণিঝড়সহ বৃষ্টিপাত হয় , একে বলে সাইক্লোন ( পশ্চিমবঙ্গেআশ্বিনের ঝড় ’ ) ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!