জলবায়ুর নিয়ন্ত্রক

জলবায়ুর নিয়ন্ত্রক

images 3 compress67
জলবায়ুর নিয়ন্ত্রক

কোনাে স্থানের জলবায়ু যেসব বিষয় বা কারণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় সেগুলি হল— ( ১ ) অক্ষাংশ , ( ২ ) উচ্চতা , ( ৩ ) সমুদ্র থেকে দূরত্ব , ( ৪ ) সমুদ্রস্রোত , ( ৫ ) বায়ুপ্রবাহ , ( ৬ ) পর্বতের অবস্থান , ( ৭ ) ভূমির ঢাল , ( ৮ ) ভূমির উপাদান , ( ৯ ) অরণ্য প্রভৃতি । এই বিষয়গুলি যে-কোনাে জায়গার জলবায়ুর প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে বলে এগুলিকে জলবায়ুর নিয়ন্ত্রক  ( factors of climate or climatic controls ) বলে । নীচে এই নিয়ন্ত্রকগুলি সম্পর্কে আলােচনা করা হল — 

অক্ষাংশ 

জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে অক্ষাংশের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । উচ্চ অক্ষাংশের তুলনায় নিম্ন অক্ষাংশে সূর্যরশ্মি বেশি পাওয়া যায় বা নিরক্ষরেখা থেকে যতই উত্তর ও দক্ষিণে যাওয়া যায় , উষ্ণতা ক্রমশ কমতে থাকে । তাই অক্ষাংশের ভিত্তিতে ভূপৃষ্ঠকে উষ্ণমণ্ডল , নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল ও হিমমন্ডল — এই তিনটি তাপমণ্ডল বা প্রধান জলবায়ুমণ্ডলে ভাগ করা হয় । শ্রীলঙ্কা ও ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য — উভয়ের অবস্থান দ্বৈপ হলেও নিম্ন অক্ষাংশে অবস্থিত বলে শ্রীলঙ্কার জলবায়ু উ‌ষ্ণ ও আর্দ্র এবং উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থিত হওয়ায় ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ । 

উচ্চতা 

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা যত বাড়ে উ‌ষ্ণতা তত কমে । সাধারণভাবে দেখা যায় , প্রতি ১০০০ মিটার উচ্চতায় গড়ে ৬.৫° সে হারে উষ্ণতা কমে যায় । এজন্য প্রায় নিরক্ষরেখার ওপর অবস্থিত হলেও উচ্চতা বেশি বলে ইকুয়েডরের রাজধানী কুইটোতে চিরবসন্ত বিরাজ করে । একই কারণে আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো পর্বতশিখর নিরক্ষরেখায় অবস্থিত হলেও চিরকাল তুষারে ঢাকা থাকে । 

সমুদ্র থেকে দূরত্ব 

স্থলভাগের তুলনায় জলভাগ দেরিতে গরম হয় এবং দেরিতে ঠান্ডা হয় । তাই গ্রীষ্মকালে স্থলভাগ যতটা উষ্ণ হয় জলভাগ ততটা উ‌ষ্ণ হয় না বা শীতকালে স্থলভাগ যতটা শীতল হয় জলভাগ ততটা শীতল হয় না । এর ফলে সমুদ্র সংলগ্ন এলাকার জলবায়ু সমভাবাপন্ন এবং সমুদ্র থেকে দূরে মহাদেশের অভ্যন্তরের জলবায়ু চরম ও মহাদেশীয় প্রকৃতির হয় । 

সমুদ্রস্রোত 

সমুদ্রে দুধরনের স্রোত প্রবাহিত হয় — উষ্ণস্রোত ও শীতল স্রোত । যে-কোনাে দুটি অঞ্চল একই অক্ষাংশে অবস্থিত হলেও একটির পাশ দিয়ে উ‌ষ্ণ স্রোত এবং অপরটির পাশ দিয়ে শীতল স্রোত প্রবাহিত হলে প্রথমটির জলবায়ু উ‌ষ্ণ এবং দ্বিতীয়টির জলবায়ু শীতল হয় । উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থিত হলেও উ‌ষ্ণ উত্তর আটলান্টিক স্রোতের প্রভাবে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের জলবায়ু বেশি শীতল হতে পারে না । কিন্তু অপেক্ষাকৃত নিম্ন অক্ষাংশে অবস্থিত হলেও শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের প্রভাবে উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলের জলবায়ু যথেষ্ট শীতল হয় এবং এখানকার সেন্ট লরেন্স নদীর জল শীতকালে অনেক দিন পর্যন্ত জমে বরফ হয়ে থাকে । 

বায়ুপ্রবাহ 

সমুদ্রস্রোতের মতাে বায়ুপ্রবাহও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে । কোনাে অঞ্চলের ওপর দিয়ে উ‌ষ্ণ বা শীতল বায়ু প্রবাহিত হলে সেখানকার জলবায়ুও উ‌ষ্ণ বা শীতল হয় । সুমেরু অঞ্চলের তীব্র শীতল বায়ুর প্রভাবে উত্তর আমেরিকার প্রায় মধ্যভাগ পর্যন্ত শীতকালে তুষারপাত হয় । আবার , জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত হয় , যেমন — আর্দ্র দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর জন্য ভারতীয় উপমহাদেশে বর্ষা ঋতুর আবির্ভাব ঘটে । 

পর্বতের অবস্থান 

উ‌ষ্ণ ও শীতল বায়ুর গতিপথে আড়াআড়িভাবে পর্বতশ্রেণী বিস্তৃত থাকলে বায়ুপ্রবাহ তাতে বাধা পায় । ফলে পর্বতশ্রেণীর দু-দিকের জলবায়ুর মধ্যে কিছুটা পার্থক্য লক্ষ করা যায় । যেমন — পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত হিমালয় পর্বতশ্রেণী শীতকালে সাইবেরিয়ার তীব্র ঠান্ডা বায়ুপ্রবাহের গতিপথে বাধা সৃষ্টি করে । এর ফলে উত্তর ভারতের জলবায়ু তিব্বতের মতাে অতটা শীতল হয় না । 

ভূমির ঢাল 

যেহেতু সূর্যের বার্ষিক আপাতগতি কর্কটক্রান্তি থেকে মকরক্রান্তি রেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ তাই যেসব ভূমি নিরক্ষরেখার দিকে ঢালু সেগুলিতে নিরক্ষরেখার বিপরীত দিকে ঢালু ভূমির তুলনায় সূর্যরশ্মি বেশি পড়ে । এজন্য নিরক্ষরেখার দিকে ঢালু ভূমি বেশি উ‌ষ্ণ হয় । এর ফলে উভয় গােলার্ধেই ভূমির উত্তর ঢালের সঙ্গে দক্ষিণ ঢালের তাপমাত্রা তথা জলবায়ুর পার্থক্য হয় ।

ভূমির উপাদান 

পলি গঠিত ভূমির তুলনায় পাথুরে ভূমি বা বালিপূর্ণ ভূমি অনেক বেশি উ‌ষ্ণ ও শীতল হয় । এজন্য পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় রাজস্থানে গরম ও ঠান্ডা — উভয়ই যথেষ্ট তীব্র । 

অরণ্য 

প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় গাছের পাতা দিয়ে জলীয় বাষ্প নির্গত হয় । এজন্য বিস্তৃত অরণ্যভূমির জলবায়ু আর্দ্র হয় ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!